ইউনূসের নজরে ভারতের সেভেন সিস্টার্স, চিন সফরে বিতর্কিত মন্তব্য মহম্মদ ইউনূসের

চিন সফরে গিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলি, যা ‘সেভেন সিস্টার্স’ নামে পরিচিত, তা নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করলেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান মহম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, ‘সেভেন সিস্টার্স’-এর জন্য ‘সমুদ্রের একমাত্র অভিভাবক’ নাকি বাংলাদেশ। ভারতের মতো একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে এই ধরনের মন্তব্য কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। ইউনূস সম্প্রতি চিনে ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত আলোচনায় অংশ নিতে গিয়েছিলেন, এবং সেখানে কেন তিনি এই প্রসঙ্গটি উত্থাপন করলেন, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই বিতর্ক শুরু হয়েছে।

উল্লেখ্য, ‘সেভেন সিস্টার্স’ ভারতের জন্য একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল অঞ্চল। উত্তর-পূর্বের এই সাতটি রাজ্য হল অসম, অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড, মণিপুর, মিজোরাম, ত্রিপুরা ও মেঘালয়।

মহম্মদ ইউনূস গত সপ্তাহে চার দিনের চিন সফরে যান এবং সেখানে একাধিক অনুষ্ঠানে ভাষণ দেন। সেই ভাষণের কিছু ভিডিও ক্লিপ বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। একটি ক্লিপে ইউনূসকে বলতে শোনা যায়, “ভারতের সাতটি রাজ্য, যা সেভেন সিস্টার্স নামে পরিচিত, এগুলো ল্যান্ডলকড দেশ। ভারতের ভূমিবেষ্টিত এলাকা। তাদের সমুদ্রে পৌঁছানোর কোনও সরাসরি পথ নেই।”

এরপরই চিনকে বিনিয়োগের আমন্ত্রণ জানিয়ে মহম্মদ ইউনূস আরও বলেন, “এই সমগ্র অঞ্চলে বাংলাদেশই সমুদ্রের একমাত্র অভিভাবক। সুতরাং এটি একটি বিশাল সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে। ফলে চিনা অর্থনীতির জন্য এটি একটি অত্যন্ত ইতিবাচক খবর।” চিনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের সম্পর্ক গত কয়েক বছর ধরে খুবই মজবুত। আমাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো এবং চিনের কারণে আমরা বহুলাংশে উপকৃত হয়েছি।”

চিকেন নেক কী?

‘চিকেন নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডোর হল ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে অবস্থিত একটি অত্যন্ত সংকীর্ণ ভূখণ্ড। এই এলাকার বিস্তার প্রায় ২০ থেকে ২২ কিলোমিটার এবং দৈর্ঘ্য প্রায় ৬০ কিলোমিটার। এটি উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলির সঙ্গে ভারতের মূল ভূখণ্ডকে সংযোগকারী একমাত্র পথ। ভৌগোলিক ও কৌশলগত দিক থেকে এই করিডোরটি অত্যন্ত সংবেদনশীল, কারণ এর চারপাশেই নেপাল, বাংলাদেশ, ভুটান এবং চিনের মতো প্রতিবেশী দেশগুলি অবস্থিত।

এই করিডোরটি কেবল সামরিক দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা অপরিহার্য। উত্তর-পূর্ব রাজ্য এবং ভারতের বাকি অংশের মধ্যে প্রধান বাণিজ্য পথ হল এই চিকেন নেক। অসম ও দার্জিলিংয়ের বিখ্যাত চা, কাঠ এবং উত্তর-পূর্বের অন্যান্য মূল্যবান সম্পদ এই পথ দিয়েই দেশের অন্যান্য প্রান্তে পৌঁছায়। কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, মহম্মদ ইউনূস সরাসরি ‘চিকেন নেক’ শব্দটির উল্লেখ না করলেও, সেভেন সিস্টার্সের ভূমিবেষ্টিত এলাকার কথা উল্লেখ করে ভারতকে পরোক্ষভাবে একটি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

ভারতের প্রতিবেশী বাংলাদেশ:

সীমান্তের দৈর্ঘ্যের বিচারে বাংলাদেশ ভারতের সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী রাষ্ট্র। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত ৪০৯৬.৭ কিলোমিটার দীর্ঘ। যে বাংলাদেশকে সেভেন সিস্টারসকে ভূমিবেষ্টিত রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে, সেই বাংলাদেশ স্থলপথে তিন দিক দিয়ে ভারত দ্বারা বেষ্টিত। ভারত ছাড়াও বাংলাদেশের একমাত্র সরাসরি প্রতিবেশী হল মায়ানমার। বাংলাদেশের দক্ষিণ সীমান্ত বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।

এদিকে, মহম্মদ ইউনূসের এই বিতর্কিত মন্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। তিনি বলেন, ইউনূসের এই মন্তব্যকে কোনওভাবেই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশের মহম্মদ ইউনূস চিনে যা বলেছেন, তা অত্যন্ত অবমাননাকর। আমি এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। চিকেন নেক করিডোরের আশেপাশে একটি শক্তিশালী রেলপথ এবং সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা অত্যন্ত প্রয়োজন। এমনকি চিকেন নেকের বিকল্প রাস্তা বা রেলপথ তৈরি করার বিষয়েও আমাদের চিন্তা করা উচিত।”