স্কুলের টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ, প্রধান শিক্ষককে আটকে রাখলেন অভিভাবকরা

দীর্ঘদিন অনুপস্থিতির পর হঠাৎ স্কুলে ফিরে আসা এক প্রধান শিক্ষককে ঘিরে বুধবার উত্তপ্ত হয়ে উঠল আসানসোলের রেলপাড় এলাকার বাবুয়াতলা কাজী নজরুল ইসলাম উর্দু ফ্রি প্রাথমিক বিদ্যালয়। অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক সৈয়দ আলম কাদরির বিরুদ্ধে স্কুলের উন্নয়ন খাতের প্রায় সাত লক্ষ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা তাঁকে প্রায় চার ঘণ্টা একটি ঘরে তালাবন্ধ করে রাখেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে পৌঁছন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তরের আসানসোল শিক্ষাচক্রের পরিদর্শক অরিজিৎ মণ্ডল, যিনি অভিভাবকদের কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ গ্রহণ করেন।
ঘটনার সূত্রপাত
গত বছরের অক্টোবর থেকে সৈয়দ আলম কাদরি স্কুলে অনুপস্থিত ছিলেন। পুলিশে অভিযোগ দায়ের করা সত্ত্বেও তাঁর কোনও খোঁজ মেলেনি। মঙ্গলবার তিনি আচমকা স্কুলে হাজির হন এবং জানান, প্রাথমিক শিক্ষা সংসদের চেয়ারম্যানের নির্দেশে তিনি কাজে যোগ দিয়েছেন। তাঁর কাছে সেই নির্দেশের চিঠিও ছিল। কিন্তু বুধবার সকালে তাঁকে দেখে অভিভাবকরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তাঁরা বিক্ষোভ শুরু করেন এবং প্রশ্ন তোলেন, “টাকা আত্মসাতের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি কীভাবে স্কুলে ফিরতে পারেন?”
অভিভাবকদের ক্ষোভ
অভিভাবকদের অভিযোগ, সৈয়দ আলম স্কুলের উন্নয়নের জন্য সরকারি তহবিল থেকে প্রায় সাত লক্ষ টাকা তছরুপ করেছেন। তাঁদের দাবি, “এমন দুর্নীতিগ্রস্ত প্রধান শিক্ষককে কিছুতেই স্কুলে রাখা যাবে না।” ক্ষোভের মধ্যে তাঁরা তাঁকে একটি ঘরে তালাবন্ধ করে রাখেন, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।
স্থানীয় প্রতিনিধি ও পুলিশের ভূমিকা
বিক্ষোভের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসেন ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের পুরপ্রতিনিধি তথা স্কুল পরিচালন সমিতির সম্পাদক সিকে রেশমা। তিনি আসানসোল উত্তর থানার পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পুলিশ জানায়, এই বিষয়ে জেলা স্কুল পরিদর্শকের সঙ্গে কথা বলা উচিত। পরে অরিজিৎ মণ্ডল ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন।
রেশমা বলেন, “২০২৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর আমি উত্তর থানায় ওঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছিলাম। ওঁর বিরুদ্ধে আমার সই জাল করে সরকারি চেক থেকে টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪০৬, ৪২০, ৪৬৭, ৪৭১ ও ৪৬৮ ধারায় মামলা হয়েছে। দেড় বছরেও পুলিশ কোনও ব্যবস্থা নিতে পারেনি, এটা অবাক করা। এটা আমার ব্যক্তিগত বিষয় নয়, রাজ্য সরকারের টাকা জালিয়াতি করে নেওয়া হয়েছে।”
পুলিশ ও ফরেন্সিক তদন্ত
পুলিশের এক আধিকারিক জানান, চেকে সই জাল কি না, তা নিশ্চিত করতে ফরেন্সিক বিভাগে পাঠানো হয়েছে। তদন্ত চলছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রাথমিক শিক্ষা সংসদের বক্তব্য
প্রাথমিক শিক্ষা সংসদের চেয়ারম্যান রথীন্দ্রনারায়ণ মজুমদার কলকাতা থেকে বলেন, “যেহেতু ওঁর জেল হয়নি, আইন অনুযায়ী তাঁকে কাজে যোগ দিতে বলা হয়েছে। তবে গত কয়েক মাস তাঁর বেতন বন্ধ রয়েছে, কারণ ছুটি পাওনা নেই। এই ঘটনার রিপোর্ট বিদ্যালয় পরিদর্শকের কাছে চেয়েছি। এই পরিস্থিতিতে তাঁকে এই স্কুলে রাখা সম্ভব নয়, অন্য স্কুলে বদলি করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, “তাঁকে তিনবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তিনি স্বীকার করেছেন, স্কুলের কিছু টাকা তাঁর কাছে রয়েছে এবং ফেরত দিতে চান। চেকে সই জাল হয়েছে কি না, তা পুলিশ তদন্ত করবে। স্কুলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয়েছে। টাকা ফেরত নেওয়ার বিষয়ে পর্ষদের সঙ্গে আলোচনা হবে।”
পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ
এই ঘটনা স্থানীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় দুর্নীতির গভীর সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। অভিভাবকদের ক্ষোভ ও প্রশাসনের পদক্ষেপের মধ্যে সৈয়দ আলম কাদরির ভাগ্য এখন তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার হাতে।