বিশেষ: রটন্তী কালীপুজোর ইতিহাস কি? জেনেনিন পুজোর পদ্ধতি ও তিথি সম্পর্কে

রটন্তী কালী পুজো হিন্দু ধর্মে একটি বিশেষ উৎসব, যা মাঘ মাসের কৃষ্ণ পক্ষের চতুর্দশী তিথিতে উদযাপিত হয়। এই দিনটি কৃষ্ণ ও কালীর একত্রে পুজো করার মাধ্যমে একটি ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক অভ্যুত্থান প্রকাশ করে। পুজোটির পেছনে রয়েছে একটি প্রাচীন কিংবদন্তি, যা এই দিনে কৃষ্ণ ও কালীর যোগসূত্র স্থাপন করে।
রটন্তী কালী পুজোর সময়
২০২৫ সালে রটন্তী কালী পুজো অনুষ্ঠিত হবে ২৭ জানুয়ারি রাত ৭:৪৪ থেকে ২৮ জানুয়ারি রাত ৭:৩১ পর্যন্ত চতুর্দশী তিথিতে। এই সময়ে ধর্মীয় অনুষঙ্গ, আনন্দ ও ভক্তিপূর্ণ পরিবেশে কৃষ্ণ ও কালীর আরাধনা হয়।
পুজোর ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক প্রেক্ষাপট
রটন্তী কালী পুজোর উৎপত্তি নিয়ে একটি জনপ্রিয় পৌরাণিক গল্প রয়েছে। কথিত আছে, একবার শ্রীরাধা তাঁর স্বামীকে লুকিয়ে মাঘ মাসের কৃষ্ণ পক্ষের চতুর্দশী রাতে শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সময় তাঁর দুই ননদিনী জটিলা ও কুটিলা বিষয়টি বুঝে ফেলেন এবং তারা এটি রাধার স্বামীকে জানিয়ে দেন। রাধার স্বামী সরাসরি বিশ্বাস না করলেও, ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি দেখতে পান যে, দেবী কালীর পদতলে সেবা করছেন শ্রীরাধিকা। এই ঘটনার মাধ্যমে কৃষ্ণ একে অপরের প্রতি সম্মান এবং একত্ব প্রতিষ্ঠা করেন, যা কৃষ্ণ ও কালীর যোগসূত্র স্থাপন করে। তারপর থেকে, এই দিনেই কৃষ্ণ এবং কালীর একসঙ্গে পুজো করা হয়।
রটন্তী কালী পুজো: বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য
রটন্তী কালী পুজো প্রথমে বাংলার গ্রামাঞ্চলে শুরু হয়, তবে বর্তমানে এটি শহর এবং গ্রাম দু’টি জায়গাতেই সমান জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষত, এটি এমন একমাত্র কালীপুজো যা অমাবস্যা তিথিতে হয় না। এই পুজোর মাধ্যমে কৃষ্ণ ও কালীর আরাধনা করার পাশাপাশি এক ধরনের সামাজিক মেলবন্ধনও সৃষ্টি হয়। বিশেষত বাংলার জমিদার বাড়ি ও মঠ-মন্দিরগুলোতে রটন্তী কালী পুজোর প্রচলন ছিল, যেখানে জমিদাররা দেবীর আশীর্বাদে তাঁদের ক্ষমতা ও প্রভাব বৃদ্ধি পেতে বিশ্বাস করতেন।
রামকৃষ্ণ পরমহংস এবং দক্ষিণেশ্বরের গঙ্গা
রটন্তী কালী পুজো নিয়ে অনেক ধর্মীয় বিশ্বাস এবং কিংবদন্তি রয়েছে। কথিত আছে, রামকৃষ্ণ পরমহংস এই পুজো উপলক্ষে দক্ষিণেশ্বরের গঙ্গায় স্বর্গ থেকে দেবতাদের স্নান করতে নেমে আসতে দেখেছিলেন। এই উপলক্ষে দক্ষিণেশ্বরের গঙ্গার ঘাটে রটন্তী পুজোর সকালে বহু ভক্ত পুণ্যস্নান করেন। পাশাপাশি, রটন্তী কালী পুজোর দিনেই দেবী ছিন্নমস্তার আবির্ভাবের কথা শোনা যায়, যেখানে দেবী পার্বতী নিজের মুণ্ডুচ্ছেদ করে ত্রিধারায় রক্তবারি করেছিলেন।
পুজোর রীতি এবং আচার
রটন্তী কালী পুজোর দিন ভক্তরা উপোস করে দেবীর আরাধনা করেন। মাটির প্রদীপ, ধূপ, বাতি এবং নৈবেদ্য দিয়ে পুজোর আয়োজন করা হয়। ভোগ হিসেবে নারকেল, লাল চাল, খিচুড়ি, ফল এবং মিষ্টি নিবেদন করা হয়। তবে, কিছু জায়গায় পশু বলির প্রথাও ছিল, যদিও বর্তমানে অনেক স্থানে তা বন্ধ হয়ে গেছে। পুজোর পর ভক্তরা শান্তি, সমৃদ্ধি এবং সুস্বাস্থ্য কামনা করে দেবীর আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন।
সামাজিক এবং ধর্মীয় গুরুত্ব
রটন্তী কালী পুজো শুধুমাত্র ধর্মীয় নয়, সামাজিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই দিনটি গোষ্ঠী ভিত্তিক মিলনের একটি কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষত এই দিনটি যেভাবে গ্রামাঞ্চল থেকে শহরে প্রসারিত হয়েছে, তা সামাজিক ঐক্য এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের বিস্তৃতি নির্দেশ করে।
এছাড়া, এই দিনটি কৃষ্ণ ও কালীর একত্রে পুজো করার মাধ্যমে ভক্তরা ধনী ও সমৃদ্ধি কামনা করেন, যা বহু পরিবারে সুখ ও শান্তির মন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
রটন্তী কালী পুজো একটি বিশেষ উৎসব, যা শুধু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, বাংলার সংস্কৃতির ও ঐতিহ্যের অংশ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। এই পুজো দ্বারা কৃষ্ণ ও কালীর শক্তির সম্মিলন ঘটে এবং ভক্তরা একত্রে শান্তি ও সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে চলেন।