হিসাবে বড় ধরণের গরমিল, বায়োমেডিক্যাল বর্জ্য নিয়ে রাজ্যের কাছে হলফনামা তলব হাইকোর্টের

আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে মহিলা চিকিৎসক ধর্ষণ-খুনের তদন্তে উঠে আসা দুর্নীতির সূত্র ধরে এবার রাজ্যজুড়ে বায়োমেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ, রাজ্যের বহু হাসপাতাল থেকে বিপুল পরিমাণ বায়োমেডিক্যাল বর্জ্য পাচার হয়ে যাচ্ছে। এই বিষয়ে রাজ্যের হলফনামা তলব করেছে জাতীয় পরিবেশ আদালত (এনজিটি)।
বিষয়টির সূত্রপাত আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনার তদন্তে। সেই তদন্তে উঠে আসে বায়োমেডিক্যাল বর্জ্যের পাচারের অভিযোগ। পরবর্তীতে জানা যায়, রাজ্যের বহু হাসপাতালেই এই কারবার চলছে। রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের রিপোর্ট অনুযায়ী, রাজ্যে যতগুলি হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে, সেই তুলনায় বায়োমেডিক্যাল বর্জ্যের পরিমাণ অনেক কম। অভিযোগ, বায়োমেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নজরদারির অভাবে এই ঘটনা ঘটছে।
পরিবেশ কর্মী সুভাষ দত্ত এই বিষয়ে প্রথমে রাজ্যের মুখ্যসচিবের কাছে অভিযোগ জানান এবং নজরদারির দাবি তোলেন। এরপর বিষয়টি এনজিটিতে গেলে, পূর্বাঞ্চলীয় বেঞ্চের বিচারপতি বি অমিত স্থালেকর এবং বিশেষজ্ঞ সদস্য অরুণ কুমার ভার্মা রাজ্য স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তর, পরিবেশ দপ্তর এবং পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদকে হলফনামার মাধ্যমে বায়োমেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। চার সপ্তাহের মধ্যে এই হলফনামা জমা দিতে হবে।
কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, রাজ্যে ৩২০৯টি হাসপাতাল ও নার্সিংহোম এবং ৬৭১৮টি ক্লিনিক ও ডিসপেনসারি রয়েছে। এগুলোতে মোট শয্যার সংখ্যা ১ লক্ষ ৬৮ হাজার ৩২৩। সেই হিসাবে রাজ্যে দৈনিক গড়ে ৪৩ হাজার ১২০ কেজি বায়োমেডিক্যাল বর্জ্য তৈরি হওয়ার কথা। গত বছরের ২৪শে জুলাই রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ এই রিপোর্ট কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদে পাঠিয়েছিল।
কিন্তু অভিযোগ, বর্তমানে শয্যার সংখ্যা আরও বেড়েছে এবং সরকারি অডিট অনুযায়ী শয্যা প্রতি দৈনিক ২৩০ গ্রাম বায়োমেডিক্যাল বর্জ্য হওয়ার কথা। শুধু হাসপাতাল-নার্সিংহোম ও ক্লিনিক নয়, রাজ্যের বিভিন্ন স্বাস্থ্য শিবির, রক্তদান শিবির ও ব্লাড ব্যাঙ্কেও বায়োমেডিক্যাল বর্জ্য তৈরি হয়, যা হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছে। অভিযোগ, হিসাবকৃত বর্জ্য এবং প্রকৃত বর্জ্যের মধ্যে বিশাল ফারাক রয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এই বর্জ্য হয় বাংলাদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে, না হলে পুনরায় ব্যবহারের জন্য বিক্রি করা হচ্ছে।
২০২১ সালের মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আইন অনুযায়ী, এই বর্জ্য নষ্ট করার নিয়ম থাকলেও, অভিযোগ তা মানা হচ্ছে না। কারণ রাজ্যে বায়োমেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনও কার্যকরী পরিকাঠামো নেই। বর্জ্য নষ্ট হচ্ছে কিনা, তা দেখার জন্য কোনও কমিটিও তৈরি হয়নি। অথচ ২০১৮ সালের আইনে বলা হয়েছিল, মেডিক্যাল বর্জ্যের পৃথকীকরণ (যেমন ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ, গজ-ব্যান্ডেজ, ব্যবহৃত গ্লাভস আলাদা রাখা) অত্যন্ত জরুরি এবং এগুলোর ব্যবস্থাপনার নিয়মও ভিন্ন। আইন অনুযায়ী, প্লাস্টিক, ফাইবার-পলিমার ও রাবার জাতীয় জিনিসপত্র নাইট্রিক অ্যাসিড দিয়ে এবং কিছু বর্জ্য অতি উচ্চতাপে নষ্ট করার কথা। সুভাষ দত্তের আরও অভিযোগ, অনেক নার্সিংহোম ও হাসপাতাল তাদের বায়োমেডিক্যাল বর্জ্য সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে মিশিয়ে দিচ্ছে।
এনজিটির এই হলফনামা তলবের নির্দেশে রাজ্য সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে এবং বায়োমেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রকৃত চিত্র প্রকাশ্যে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।