ইথিওপিয়ার জঙ্গল থেকে দিল্লি এয়ারপোর্ট! ১০ মাসের মেগা অপারেশনে কীভাবে ধরা পড়ল মোস্ট ওয়ান্টেড আফ্রিদি?

আন্তর্জাতিক অপরাধ দমন এবং বিদেশে লুকিয়ে থাকা অপরাধীদের ভারতে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করেছে পঞ্জাব পুলিশ। পঞ্জাব পুলিশের অ্যান্টি গ্যাংস্টার টাস্ক ফোর্স (AGTF), কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এবং ওভারসিজ ফিউজিটিভ ট্র্যাকিং অ্যান্ড এক্সট্রাডিশন সেল (OFTEC)-এর যৌথ অভিযানে আফ্রিকা মহাদেশের দেশ ইথিওপিয়া থেকে গ্রেফতার করে দেশে ফেরানো হয়েছে কুখ্যাত গ্যাংস্টার গুরবিন্দর সিং ওরফে আফ্রিদিকে। পঞ্জাব পুলিশের ইতিহাসে এটিই প্রথম ঘটনা, যেখানে আফ্রিকার কোনো দেশ থেকে কোনো ওয়ান্টেড অপরাধীকে ভারতে ডিপোর্ট (Deport) করা সম্ভব হলো।

দিল্লি বিমানবন্দরে পা রাখতেই পঞ্জাব পুলিশ অভিযুক্ত আফ্রিদিকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। পঞ্জাবের ডিজিপি গৌরব যাদব জানিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত সিং মানের নির্দেশে রাজ্যে গ্যাংস্টারদের নির্মূল করতে যে ‘গ্যাংস্টারান তে বার’ (Gangsteran Te Vaar) অভিযান চালানো হচ্ছে, তারই অধীনে এই বিশাল সাফল্য এসেছে।

১০ মাসের দীর্ঘ ‘অপারেশন শহীদ’

গুরবিন্দর সিং আফ্রিদিকে ভারতে ফেরাতে প্রায় ১০ মাস ধরে এক গোপন ও জটিল মিশন চালায় ভারতীয় এজেন্সিগুলো, যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন শহীদ’। এজিটিএফ-এর স্পেশাল ডিজিপি প্রমোদ বান এবং কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের আইজি আশিস চৌধুরীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ইন্টারপোল এবং আন্তর্জাতিক এজেন্সির সাথে সমন্বয় রেখে এই পুরো অপারেশন পরিচালিত হয়।

ভুয়ো পাসপোর্টে দেশত্যাগ ও চোর-পুলিশ খেলা

পঞ্জাব পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩১ মার্চ মুম্বই বিমানবন্দর থেকে ভুয়ো পরিচয়ে পালিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে (UAE) গা ঢাকা দেয় আফ্রিদি। এই যাত্রায় সে উত্তরপ্রদেশের লখনউ থেকে ইস্যু করা গোরক্ষপুরের এক বাসিন্দার জাল নথিতে তৈরি পাসপোর্ট ব্যবহার করেছিল।

বিদেশে পৌঁছানোর পর ভারতীয় এজেন্সির চোখ এড়াতে ক্রমাগত নিজের অবস্থান বদলাতে থাকে আফ্রিদি:

৩১ মার্চ ২০২৫: জাল পাসপোর্টে মুম্বই থেকে ইউএই পাড়ি।

ইস্তাম্বুল হয়ে মেক্সিকো পালানোর চেষ্টা: ইউএই থেকে ইস্তাম্বুল রুট ধরে মেক্সিকো পালানোর ছক কষলেও তা ব্যর্থ হয় এবং তাকে পুনরায় ইউএই ফেরত পাঠানো হয়।

এপ্রিল ২০২৬: ইউএই থেকে কেনিয়ায় চম্পট।

জুন ২০২৬: কেনিয়া থেকে অ্যাঙ্গোলায় গা ঢাকা।

নভেম্বর ২০২৬: অ্যাঙ্গোলা থেকে পৌঁছায় ইথিওপিয়ায়।

অবশেষে ইন্টারপোলের ৭টি রেফারেন্স এবং রেড কর্নার নোটিশের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের ৬ নভেম্বর ইথিওপিয়া থেকে ভারতীয় এজেন্সির সহায়তায় তাকে জালে তোলা হয়।

৩০টিরও বেশি গুরুতর অপরাধ ও ৫টি হাই-প্রোফাইল খুন

আফ্রিদির বিরুদ্ধে ভারতে খুন, খুনের চেষ্টা, তোলাবাজি ও অস্ত্র আইনের অধীনে ৩০টিরও বেশি গুরুতর মামলা বিচারাধীন। বিশেষ করে পঞ্জাবের পাঁচটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডে সে সরাসরি যুক্ত ও ওয়ান্টেড ছিল:
১. আপ (AAP) পঞ্চায়েত প্রধান রাজবিন্দর সিং হত্যা (অক্টোবর ২০২৪)
২. ১২ বছরের শিশু গুরসেবক সিং হত্যা (মার্চ ২০২৫)
৩. ভিকি চুঘ হত্যাকাণ্ড (মার্চ ২০২৫)
৪. জসবন্ত সিং হত্যা (মে ২০২৫)
৫. কংগ্রেস ব্লক সভাপতি গুরমেল সিং হত্যাকাণ্ড (সেপ্টেম্বর ২০২৫)

পঞ্জাব পুলিশের মতে, বিদেশে বসে ভারতীয় নেটওয়ার্ক পরিচালনা করা গ্যাংস্টারদের বিরুদ্ধে এই ডিপোর্টেশন এক কড়া বার্তা। পুলিশ এখন আফ্রিদিকে পঞ্জাবে নিয়ে গিয়ে তার আন্তর্জাতিক অপরাধ নেটওয়ার্ক, বেআইনি অস্ত্রের উৎস এবং তোলাবাজির চক্র নিয়ে ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ চালাবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *