শুধু রাম-সীতার ঘরে ফেরা নয়! জানেন কি দেশের কোন প্রান্তে কেন পালিত হয় এই বিশেষ দীপাবলি?

আলোর উৎসব মানেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে অযোধ্যার রাম কি প্যাড়িতে প্রজ্বলিত ৩০ লক্ষ প্রদীপের রোশনাই, শ্রীরামচন্দ্রের ঘরে ফেরার আনন্দ আর চারপাশের চোখধাঁধানো সাজসজ্জা। উত্তর ভারতে দীপাবলি মানেই রাম-সীতার বন্দনা। কিন্তু আপনি কি জানেন, গোটা ভারতে এই একটাই আলোর উৎসব কীভাবে একেক রাজ্যে একেকটি ভিন্ন এবং রোমহর্ষক ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে? ডেইলিয়ান্টের পাঠকদের জন্য রইল দীপাবলির সেই অজানা ও বৈচিত্র্যময় রূপের এক আকর্ষণীয় খোঁজ।
১. অযোধ্যায় রামের ফেরা ও আলোর উৎসব
উত্তর ভারত তথা মূলধারার পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, চৌদ্দ বছরের বনবাস কাটিয়ে লঙ্কা জয় করে স্ত্রী সীতা ও ভাই লক্ষ্মণকে নিয়ে অযোধ্যায় ফিরেছিলেন ভগবান রাম। প্রিয় রাজকুমারকে স্বাগত জানাতে দীপমালায় সেজে উঠেছিল গোটা নগরী। এই দিনটিই আমাদের শিখিয়েছে যে প্রদীপ কেবল সাজসজ্জার উপকরণ নয়, বরং তা আশা, আলো ও ধর্মে ফেরার প্রতীক।
২. জৈন ধর্মে ভগবান মহাবীরের নির্বাণ
উত্তর ভারতের উদযাপনের ধারা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা জৈন সম্প্রদায়ের কাছে দীপাবলি। জৈন ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী, এই বিশেষ দিনেই বিহারের পাওয়ায় পুরীতে নশ্বর দেহত্যাগ করে মোক্ষ বা নির্বাণ লাভ করেছিলেন ভগবান মহাবীর। তাঁর চরম জ্ঞান ও আলোর স্মরণে জৈন ধর্মে প্রদীপ জ্বালানো হয়। তবে এখানে বাহ্যিক জাঁকজমকের চেয়ে আত্মচিন্তন, সংযম, অহিংসা এবং মহাবীরের পরোপকারী শিক্ষার ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়।
৩. শিখ সম্প্রদায়ের ঐতিহাসিক ‘বন্দি ছাড় দিবস’
সিখ ধর্মের ইতিহাসে দীপাবলির দিনটি অত্যন্ত গৌরবময় ‘বন্দি ছাড় দিবস’ হিসেবে পালিত হয়। এই দিনেই মুঘল জেলের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন শিখদের ষষ্ঠ গুরু, গুরু হরগোবিন্দ সাহিব। শুধু নিজে মুক্ত হওয়াই নয়, তাঁর কূটনৈতিক ও সাহসিকতার জোরে সেদিন মুক্ত হয়েছিলেন আরও বহু বন্দি রাজা। এই বিশেষ দিনটির স্মরণে অমৃতসরের ঐতিহাসিক হরমন্দির সাহিব বা স্বর্ণমন্দির আলোকমালায় সেজে ওঠে। এটি মূলত অন্যায় ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে সাহসিকতা এবং ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর প্রতীক।
৪. বাংলায় শক্তির আরাধনা: মহাশক্তি কালী পুজো
পশ্চিমবঙ্গ এবং পূর্ব ভারতের বিস্তীর্ণ অংশ জুড়ে দীপাবলির রাত মানেই শ্যামা মায়ের আরাধনা। আলোর উৎসবের এই রাতে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনে দেবী কালীর পুজো করা হয়। মা কালী হলেন শক্তি, নির্ভয়তা এবং অশুভ শক্তির বিনাশের মূর্ত প্রতীক। প্রদীপের আলোর রোশনাইয়ের পাশাপাশি বাংলার এই পুজো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অন্ধকার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে শক্তির আরাধনা কতটা জরুরি।
৫. দক্ষিণ ভারতে ‘নরকাসুর বধ’ উৎসব
ভারতের দক্ষিণাংশে দীপাবলির প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে দীপাবলি পালিত হয় অত্যাচারী ও পরাক্রমী অসুর নরকাসুরের বধের স্মরণে। পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, ভগবান কৃষ্ণ ও সত্যভামার হাতে এই দুষ্ট অসুরের বিনাশ হয়েছিল এবং বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন অসংখ্য মানুষ। দক্ষিণ ভারতে সূর্যোদয়ের আগেই স্নান সেরে, নতুন জামাকাপড় পরে এবং নরকাসুরের পুতুল পুড়িয়ে এই উৎসব উদযাপনের প্রাচীন রীতি রয়েছে।
বৈচিত্র্যেই ভারতের আসল সৌন্দর্য
রামের অযোধ্যা ফেরা হোক, মহাবীরের নির্বাণ, গুরু হরগোবিন্দ সাহিবের মুক্তি, কিংবা মা কালীর পুজো— প্রতিটি ঘটনার মূল সুরটি কিন্তু একই। তা হলো— অন্ধকারের বিনাশ ঘটিয়ে আলোর জয়, ভয়ের ওপর সাহসের জয় এবং বাঁধন কেটে মুক্তির আনন্দ। আর এই বৈচিত্র্যই দীপাবলি উৎসবকে আমাদের জীবনে আরও বেশি অর্থবহ ও বর্ণময় করে তোলে।