AI দিয়ে ভোটার নাম কাটার অভিযোগ! কড়া নজরদারিতে কমিশনের আইটি প্রধান সীমা খান্না, নেপথ্যে কোন বিতর্ক?

রাজ্য রাজনীতি থেকে জাতীয় স্তর— বঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের সময় থেকেই নির্বাচন কমিশনের আইটি বিভাগের প্রধান সীমা খান্নাকে ঘিরে বিতর্কের পারদ চড়েছিল।  মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ তুলেছিলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI ব্যবহার করে ভোটার তালিকা থেকে বৈধ ভোটারদের নাম বাদ দিয়েছেন সীমা খান্না। সেই চর্চিত আধিকারিককে নিয়েই এবার এক তাৎপর্যপূর্ণ ও বড় সিদ্ধান্ত নিল নির্বাচন কমিশন।

দীর্ঘ টানাপোড়েন ও বিতর্কের পর সীমা খান্নার কাজের ওপর নজরদারির প্রশাসনিক কাঠামো ফের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হলো। নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, তাঁর কাজের ওপর ফের বসানো হয়েছে নজরদারির ওপরের স্তর।

কাজের নজরদারিতে বড় রদবদল

গত ৪ নভেম্বর নির্বাচন কমিশনের তরফে কাজের দায়িত্ব বণ্টন সংক্রান্ত একটি নতুন নির্দেশিকা জারি করা হয়। সেখানে বলা হয়েছে, আইটি এবং আইসিটি বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সিনিয়র ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার পবনকুমার শর্মাকে। পাশাপাশি, আইটি বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল (DG) সীমা খান্নাকে এখন থেকে সরাসরি ফাইল না পাঠিয়ে নবনিযুক্ত ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার প্রকাশরাজ পুরোহিতের মাধ্যমে কাজ করতে হবে।

পূর্বে তিনি সিনিয়র ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার মনীশ গর্গের তত্ত্বাবধানে কাজ করতেন। নতুন এই কাঠামোগত রদবদলকে কমিশনের কার্যক্ষেত্রে এক প্রকার ‘অবস্থান পরিবর্তন’ বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞরা।

২৮ জুলাইয়ের নির্দেশ ও ৩ মাসের গোপনীয়তা

ঘটনার সূত্রপাত চলতি বছরের গত ২৮ জুলাই। তৎকালীন কর্মকর্তা মনীশ গর্গ এক নির্দেশে জানান, সীমা খান্না এবার থেকে সরাসরি নির্বাচন কমিশনারদের কাছে রিপোর্ট করবেন। এর আগে তিনি কাজ করতেন ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার সঞ্জয় কুমারের অধীনে। কিন্তু সঞ্জয় কুমারের বদলি হওয়ার পর সীমা খান্নাকে সরাসরি শীর্ষস্তরে রিপোর্ট করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

তবে সূত্রের খবর, এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে ফাইল নোট দিয়েছিলেন দুই নির্বাচন কমিশনার বিবেক যোশী ও সুখবীর সান্ধু। পরবর্তীতে নির্বাচন কমিশনের তরফ থেকেও জানানো হয়, কমিশনারদের আপত্তির কারণে ২৮ জুলাইয়ের ওই নির্দেশ নাকি কখনও কার্যকরই হয়নি।

কিন্তু এখানেই উঠছে বড় প্রশ্ন— জুলাই মাসের সেই নির্দেশ যদি কার্যকরই না হয়ে থাকে, তবে ঠিক তিন মাস পর ৪ নভেম্বর নতুন করে একই বিষয়ে পুনর্বিন্যাসের নির্দেশিকা জারি করতে হলো কেন?

ECI NET বিতর্ক ও আইনের বাঁধন

এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব সফটওয়্যার ‘ECI NET’ ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কে।

  • কী এই ECI NET? চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি প্রায় ১০০ কোটি ভোটারের বিশাল ডাটাবেস ও ৪০টিরও বেশি অ্যাপ-পোর্টালকে এক ছাতার তলায় আনতে ‘ECI NET’ চালু করেছিলেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার।

  • অভিযোগের তির: এই সফটওয়্যার ব্যবস্থার মাধ্যমেই প্রযুক্তিগত কারচুপি ও নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে সরব হয়েছিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

আইন কী বলছে? জনপ্রতিনিধিত্ব আইন (১৯৫০) এবং ভোটার নিবন্ধন বিধি (১৯৬০) অনুযায়ী, ভোটার তালিকা সংশোধনের (নাম কাটা বা জোড়া) আইনি দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে ‘ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার’ (ERO) বা সমমর্যাদার মহকুমাশাসকদের হাতে ন্যস্ত থাকে। যাতে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, বিশেষ বিভাগ বা কেন্দ্রীয় সফটওয়্যারের হাতে এককভাবে ভোটার তালিকার রাশ না চলে যায়, তার জন্যই আইনে এই স্বচ্ছতা রাখা হয়েছে।

আইনি কাঠামোর সেই নীতি বজায় রাখতেই কি শেষ পর্যন্ত পিছপা হতে হলো কমিশনকে? বিতর্কিত সফটওয়্যার ও সীমা খান্নার রিপোর্টিং স্ট্রাকচার ঘিরে এই অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন এখন জাতীয় রাজনীতির অন্যতম চর্চিত বিষয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *