নমুনা সমীক্ষাতেই মিলল ভুয়ো ডাক্তার! রাজ্যের ১ লক্ষ ১০ হাজার চিকিৎসকের রেজিস্ট্রেশন নতুন করে যাচাইয়ের কড়া সিদ্ধান্ত

রাজ্যের চিকিৎসাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে এবং সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এক যুগান্তকারী ও কঠোর পদক্ষেপ করল রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর। সম্প্রতি একটি নমুনা সমীক্ষায় একাধিক ভুয়া বা জাল চিকিৎসকের সন্ধান মেলায় নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে—রাজ্যে নথিভুক্ত প্রায় ১ লক্ষ ১০ হাজার চিকিৎসকের রেজিস্ট্রেশন এবং সমস্ত শংসাপত্র নতুন করে পুরোপুরি যাচাই করা হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, এই বিশেষ প্রক্রিয়ার পোশাকি নাম দেওয়া হয়েছে ‘Know Your Doctor’ (KYD)। এর মাধ্যমে শুধু ভুয়ো চিকিৎসকরাই নয়, বরং মৃত ব্যক্তি, বিদেশে পাকাপাকিভাবে চলে যাওয়া কিংবা দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা পেশার সঙ্গে কোনোভাবেই যুক্ত নন—এমন ব্যক্তিদের নামও রেজিস্ট্রেশন তালিকা থেকে চিরতরে বাদ দেওয়া হবে।
কীভাবে হবে এই ‘Know Your Doctor’ যাচাই প্রক্রিয়া?
রাজ্যের বিশাল সংখ্যক চিকিৎসকের তথ্য নিখুঁতভাবে যাচাই করতে দুটি আলাদা পদ্ধতি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে:
-
ম্যানুয়াল KYD (MKYD): যে সমস্ত চিকিৎসক সরাসরি এসে নিজেদের নথি দেখাতে ইচ্ছুক, তাঁরা সরাসরি রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলে গিয়ে সমস্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে পারবেন।
-
ভিডিও KYD (VKYD): বয়স্ক চিকিৎসক কিংবা দূরবর্তী জেলা বা ভিনরাজ্যে ও বিদেশে থাকা চিকিৎসকদের সুবিধার জন্য ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে অনলাইনে নথি যাচাইয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রয়োজনে এই কাজে বিশেষ বেসরকারি সংস্থার সাহায্যও নেওয়া হতে পারে।
এছাড়াও, স্বাস্থ্য দফতরের পুরনো সফটওয়্যার বদলে সম্পূর্ণ নতুন এবং উন্নত আইটি পরিকাঠামো গড়ে তোলার কাজও শুরু হয়েছে, যাতে সমস্ত পুরনো তথ্য সুরক্ষিত রেখেই নতুন তালিকা প্রস্তুত করা যায়।
ভিনরাজ্যের ডিগ্রি ও মাইগ্রেশন নিয়ে কঠোর নজরদারি
শুধু রাজ্যের নিজস্ব চিকিৎসকরাই নন, প্রতিবেশী রাজ্য যেমন—ওড়িশা, বিহার, অসম ও ঝাড়খণ্ড থেকে পশ্চিমবঙ্গে এসে যাঁরা রেজিস্ট্রেশন বা মাইগ্রেশন করিয়েছেন, তাঁদের নথি নিয়ে বিশেষ সতর্কতা নেওয়া হচ্ছে। ওই সমস্ত চিকিৎসকদের মূল রেজিস্ট্রেশন কোথায় এবং কোন মেডিক্যাল কাউন্সিল থেকে ইস্যু করা হয়েছিল, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলিতে সরাসরি সরকারি আধিকারিক পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর স্পষ্ট বার্তা: “আতঙ্কের কোনো কারণ নেই”
এই মেগা ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া নিয়ে যাতে চিকিৎসকমহলে কোনো বিভ্রান্তি না ছড়ায়, সে বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি পরিষ্কার করে জানিয়েছেন যে, এই যাচাইকরণের ফলে বর্তমান সময়ে কর্মরত কোনো চিকিৎসকের রেজিস্ট্রেশনের বৈধতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা হচ্ছে না বা তাঁদের ডিগ্রি নিয়ে কোনো সংশয় নেই। এই মুহূর্তে রাজ্যের সমস্ত চিকিৎসকের রেজিস্ট্রেশনই বৈধ রয়েছে। মূলত তালিকার একটি সামগ্রিক ‘স্যানিটাইজেশন’ বা শুদ্ধিকরণ ঘটিয়ে একটি সম্পূর্ণ নির্ভুল ও স্বচ্ছ ডেটাবেস তৈরি করাই এই অভিযানের মূল লক্ষ্য।
এছাড়াও, আসন্ন রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের নির্বাচনের সঙ্গে এই ভেরিফিকেশনের দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই বলেও স্পষ্ট করে দিয়েছেন মন্ত্রী। তবে আইনি দিকটি নিশ্চিত করতে ইতিমধ্যেই জাতীয় মেডিক্যাল কমিশন (NMC)-এর কাছে ইমেলের মাধ্যমে মতামত জানতে চাওয়া হয়েছে। কমিশনের চূড়ান্ত নির্দেশ আসার আগেই দ্রুত এই বিষয়ে সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি করা হবে। উৎসবের মরশুমের কারণে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে কিছুটা সময় লাগলেও, এই পদক্ষেপে ভুয়ো চিকিৎসকদের চক্র চিরতরে নির্মূল হবে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।