হামলা চালিয়েও রোখা গেল না ইরানকে! মাটির নিচে সুবিশাল পারমাণবিক ও মিসাইল ঘাঁটি বানাচ্ছে তেহরান, স্যাটেলাইট চিত্রে গোপন তথ্য ফাঁসে তোলপাড়

যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের একের পর এক প্রাণঘাতী বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের সামরিক অবস্থান পুনর্গঠনে নজিরবিহীন গতিতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। সম্প্রতি সংগৃহীত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন স্যাটেলাইট চিত্রে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, তেহরান তার অন্তত দুটি প্রধান ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির কাছে ব্যাপকভাবে নতুন নির্মাণকাজ চালাচ্ছে এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত সামরিক স্থাপনাগুলো দ্রুত মেরামতের কাজ সম্পন্ন করছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক গোয়েন্দা সংস্থা MAIAR-এর বিশ্লেষকরা স্যাটেলাইট ছবি পর্যালোচনা করে বিবিসি ভেরিফাইকে নিশ্চিত করেছেন যে, রাজধানী তেহরানের কাছে অবস্থিত ‘কারাজের গারমদারেহ সামরিক ঘাঁটি’ এবং উত্তরাঞ্চলের ‘শাহরৌদ ঘাঁটিতে’ ব্যাপক খননকাজ এবং নতুন ভবন নির্মাণের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মেলেছে। এছাড়াও দেশের অন্তত ১২টি কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র কমপ্লেক্স ও বিমান ঘাঁটিতে তড়িঘড়ি সংস্কারের কাজ চলছে।
হামলা এড়াতে মাটির নিচে ক্ষেপণাস্ত্র কারখানা
ইরান বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ (CIA)-র প্রাক্তন বিশ্লেষক জিম ল্যামসন জানান, শাহরৌদ ঘাঁটির কাছে যে বিশাল খননকাজ দেখা যাচ্ছে, তা মূলত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের উদ্দেশ্যে করা ভূগর্ভস্থ কারখানা হতে পারে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (IRGC) তাদের প্রধান অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রগুলোকে বিমান হামলার নাগাল থেকে বাঁচাতে সম্পূর্ণ মাটির গভীরে সরিয়ে নেওয়ার কৌশল গ্রহণ করেছে।
একইভাবে ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (FPRI) বিশ্লেষক স্যাম লেয়ারের মতে, কারাজ থেকে পাওয়া ছবিতে একটি সুসংগঠিত ভূগর্ভস্থ সামরিক স্থাপনার নতুন প্রবেশপথ সুস্পষ্ট হয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থাপনা মাটির নিচে নিয়ে যাওয়ার বড় সুবিধা হলো বাইরের কোনো বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষে এর প্রকৃত পরিধি, ক্ষমতা এবং অস্ত্র ভাণ্ডার মূল্যায়ন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে পারচিন ও কোমে ব্যাপক কাজ
ইরাক সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত পশ্চিম ইরানের কেরমানশাহ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনগুলোতে ইতিমধ্যেই নতুন শক্তিশালী ছাদ তৈরি করা হয়েছে। অন্যদিকে রাজধানীর পূর্বে অবস্থিত বিতর্কিত ‘পারচিন সামরিক কমপ্লেক্স’-এর তালেঘান-২ স্থাপনায় হামলার পর ক্ষতিগ্রস্ত ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারগুলোকে কংক্রিট দিয়ে আরও শক্তিশালী করা হয়েছে।
এমএআইএআর (MAIAR)-এর বিশ্লেষকরা কোম (Qom) শহরের কাছে ফোর্দো ভূগর্ভস্থ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র এবং সংলগ্ন সুড়ঙ্গের মুখেও নতুন নির্মাণকাজ চিহ্নিত করেছেন। বহুবার বোমা হামলার পরও এ ধরনের বড় বাজেটের পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, তেহরান নিজেদের আণবিক ও সামরিক সক্ষমতা রক্ষা করতে মরিয়া।
হোয়াইট হাউসের ধ্বংসের দাবিকে বুড়ো আঙুল
মার্কিন পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসের তরফে বারবার দাবি করা হচ্ছিল যে, যৌথ হামলায় ইরানের ড্রোন, ব্যালিস্টিক মিসাইল ও সামরিক ব্যবস্থার প্রায় ৯০ শতাংশ ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। পেন্টাগন জানিয়েছিল, হামলা চালানোর ক্ষমতা হারিয়েছে ইরান। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বিশৃঙ্খলা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে তেহরান।
রাষ্ট্রীয় টিভিতে সম্প্রতি সম্প্রচারিত ফুটেজে দেখা গিয়েছে, দক্ষিণ ইরানের সুবিশাল ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ থেকে সারি সারি আধুনিক ‘খোরদাদ’ ভূমি-থেকে-আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র বেরিয়ে আসছে।
ফের মার্কিন হামলার জল্পনা ও মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতি
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হতেই মার্কিন প্রশাসন ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর পুনরায় বড় ধরনের আকাশপথে আক্রমণ চালাতে পারে বলে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহলে জল্পনা তীব্র হচ্ছে।
তবে ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও এই মুহূর্তে বেশ সরগরম। মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, সাম্প্রতিক নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের প্রত্যাশিত ফলাফল না হওয়ার পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রতি সাধারণ আমেরিকানদের চরম অনীহাই দায়ী। তবে সেন্টারিং ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (CSIS)-এর সামরিক বিশ্লেষক মার্ক ক্যানসিয়ান স্পষ্ট জানিয়েছেন, স্যাটেলাইট চিত্রই প্রমাণ করছে—তেহরান দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠনের চেয়ে ভবিষ্যৎ মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা ঠেকানোর জন্য সামরিক পরিকাঠামো প্রস্তুত করাকেই এখন প্রধান অগ্রাধিকার দিচ্ছে।