এক রাতেই চোখের পলকে রক্তগঙ্গা ওয়াল স্ট্রিটে! মার্কিন মিডটার্ম নির্বাচনের পরেই কেন হুড়মুড়িয়ে ভাঙল শেয়ার বাজার?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিডটার্ম বা মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতি তথা শেয়ার বাজারে কতটা গভীর হতে পারে, সেদিকেই এতদিন তীক্ষ্ণ নজর ছিল আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের। প্রাথমিক পর্যায়ে ডেমোক্রেট দলের জয় এবং মার্কিন কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে চলে যাওয়ায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত শুল্কনীতি নিয়ে কিছুটা হলেও অনিশ্চয়তা কাটবে—এমন আশাবাদী ধারণার বশবর্তী হয়ে মার্কিন ওয়াল স্ট্রিট থেকে শুরু করে ভারতীয় দালাল স্ট্রিট পর্যন্ত সাময়িক উল্লাস দেখা গিয়েছিল। বুধবারের চাঙ্গা বাজারের রেশ ধরে বৃহস্পতিবার ভারতীয় বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের (BSE) সেনসেক্স এক লাফে ১,৫১৯ পয়েন্ট বা ১.৯৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৭৮,৮২০.৪০ পয়েন্টে পৌঁছেছিল। অন্যদিকে, ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের (NSE) নিফটি ৫০ সূচকও চাঙ্গা হয়ে ২৪,৩৯৭.৩০ পয়েন্টের কাছাকাছি লেনদেন করছিল।
কিন্তু শুক্রবারের প্রাতঃকালীন সূচক প্রকাশ পেতেই সমস্ত আশাবাদী হিসাব-নিকাশ উল্টে যায় এবং ওয়াল স্ট্রিটের ছবিটা এক পলকে সম্পূর্ণ বদলে গিয়ে রক্তক্ষয়ী রূপ নেয়। বিগত ১৯ মাসের মধ্যে মার্কিন শেয়ার বাজারে এটাই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং বিধ্বংসী ধস হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, সবচেয়ে বেশি মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে প্রযুক্তি খাতের সূচকগুলি। বিশেষ করে নাসডাক কম্পোজিট সূচকে নেমে এসেছে সর্বকালের রেকর্ড পতন। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ (S&P 500) সূচকও ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। হঠাৎ করে মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এই চরম উদ্বেগের মূল কারণ কী, তা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই আকস্মিক আতঙ্কের সূত্রপাত হয়েছে মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং সেমিকন্ডাক্টর চিপ প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলির শেয়ার দর অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়া নিয়ে। রাতারাতি বাজারে টেক স্টকগুলির ওপর তীব্র বিক্রির চাপ (Selling Pressure) তৈরি হয়। ৫ নভেম্বর নাসডাক কম্পোজিট সূচক এক ধাক্কায় ৫.৫২ শতাংশ পতন দেখেছে, যা গত ১৯ মাসের মধ্যে একক দিনে সবচেয়ে বড় দরপতন। পাশাপাশি, এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ৪.৩৬ শতাংশ এবং ডাউ জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল এভারেজ ৩.৪৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এই তিনটি প্রধান সূচকই এপ্রিল ২০২৫-এর পর একদিনের সর্ববৃহৎ পতনের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। এমনকি নাসডাক ১০০ সূচকটি ഒറ്റ দিনে ৬.৩৬ শতাংশ কমেছে, যা ২০২০ সালে করোনা মহামারী পরবর্তী বিশ্ববাজারের ধসের স্মৃতিকে পর্যন্ত ম্লান করে দিয়েছে।
সবচেয়ে বেশি আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় চিপ নির্মাতারা। জনপ্রিয় টেক জায়ান্ট অ্যাডভান্সড মাইক্রো ডিভাইসেস (AMD)-এর শেয়ার দর এক লাফে ১৭.৩ শতাংশ এবং মাইক্রন টেকনোলজির দর ১৭.৫ শতাংশ হুড়মুড়িয়ে নেমে গেছে। এছাড়া গেম চেঞ্জার হিসেবে পরিচিত চিপ নির্মাতা কোম্পানি এনভিডিয়া (Nvidia)-র শেয়ার মূল্যও ৯.৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু কেন হঠাৎ এই ধস? প্রযুক্তি খাতের বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এর পেছনে রাজনৈতিক কারণও জড়িত। মার্কিন নির্বাচনের প্রচার চলাকালীন ডেমোক্রেটিক দলের একাধিক প্রভাবশালী প্রার্থী এআই ডেটা সেন্টারগুলির দ্রুত ও অপরিকল্পিত সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে কড়া প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁরা মূলত পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা, বিপুল পরিমাণে বিদ্যুৎ শক্তির অপচয় এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের ওপর ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক খরচের বোঝা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর সেই রাজনৈতিক ও পরিবেশগত নীতিগুলিই এখন বিনিয়োগকারীদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বিশ্ব শেয়ার বাজারে।