কলকাতা পুরভোটে হাই কোর্টের চরম ব্রেক! এক এক ঘণ্টার ব্যবধানে বদলে গেল পুরো খেলা, ভোট কি অনিশ্চিত?

কলকাতা পুরসভার (KMC) বহুল প্রতীক্ষিত নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর এক নজিরবিহীন ও চরম আইনি স্থগিতাদেশ জারি করল কলকাতা হাইকোর্ট। পুরসভার নতুন ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস বা ‘ডিলিমিটেশন’ সংক্রান্ত আইনি জটিলতা ও মামলার যতক্ষণ না সম্পূর্ণ বিচারিক নিষ্পত্তি হচ্ছে, রাজ্য নির্বাচন কমিশন কলকাতা পুরনিগমের কোনো নির্বাচনী নির্ঘণ্ট বা নোটিফিকেশন প্রকাশ করতে পারবে না বলে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে উচ্চ আদালত। শুক্রবার বিচারপতি সব্যসাচী ভট্টাচার্য ও বিচারপতি অর্জুন রায় মুখোপাধ্যায়ের সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ এই ঐতিহাসিক অন্তর্বর্তী আদেশ দান করেন। আদালতের এই কড়া পদক্ষেপের পর তিলোত্তমার বহুল চর্চিত পুরভোটের ভবিষ্যৎ আবারও চরম আইনি ধোঁয়াশা এবং অনিশ্চয়তার আঁধারে গিয়ে পৌঁছাল।

আইনি সূত্রের খবর, কলকাতা পুরসভার আসন বা ওয়ার্ড সংখ্যা 기존 ১৪৪টি থেকে একলাফে বাড়িয়ে ২০৯টিতে উন্নীত করার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু হতেই বিবাদের সূচনা হয়। রাজ্য সরকারের নেওয়া এই সিদ্ধান্ত এবং ওয়ার্ড সীমানা নির্ধারণের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে কলকাতা হাইকোর্টের দরজায় কড়া নাড়েন কসবার বাসিন্দা তথা সিপিআই(এম) নেত্রী দীপু দাস। পরবর্তীতে সিঙ্গল বেঞ্চে বিচারপতি হিরণ্ময় ভট্টাচার্যের আদালতে এই মামলা উঠলে তিনি তাৎক্ষণিক কোনও স্থগিতাদেশ না দিয়ে রাজ্য সরকারকে চার সপ্তাহের মধ্যে হলফনামা পেশের নির্দেশ দেন এবং মামলাকারীকে তার পরবর্তী দুই সপ্তাহের মধ্যে জবাব পেশ করতে বলেন। সিঙ্গল বেঞ্চের এই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে মামলাকারী দীপু দাস দ্রুত ডিভিশন বেঞ্চের আপিল আবেদন জানান।

মামলাকারীর পক্ষে বিশিষ্ট আইনি পরামর্শদাতা এবং বর্ষীয়ান আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য আদালতে জোরালো সওয়াল পেশ করেন। তাঁদের মূল যুক্তি ছিল, সিঙ্গল বেঞ্চে হলফনামা বিনিময় সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতেই কমপক্ষে ছয় সপ্তাহ সময় লেগে যাবে। ততদিনে যদি রাজ্য নির্বাচন কমিশন ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণা করে নির্বাচন সম্পন্ন করে ফেলে, তবে সিঙ্গল বেঞ্চে বিচারাধীন মূল মামলাটি একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বহীন হয়ে পড়বে। এছাড়া সওয়ালে আরও অভিযোগ তোলা হয় যে, গত ১১ সেপ্টেম্বর রাজ্যের জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে ওয়ার্ড সীমানা পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে জনসংখ্যার সামঞ্জস্য, ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রশাসনিক ভারসাম্য একেবারেই মানা হয়নি। এমনকি নির্বাচিত পুরসভা ভেঙে যাওয়ার পর পুর কমিশনারের একা এমন সুপারিশ করার আদৌ কোনও আইনি এক্তিয়ার বা ক্ষমতা আছে কি না, তা নিয়েও বড়সড় প্রশ্ন তোলেন তিনি।

অন্যদিকে, কলকাতা পুরসভার পক্ষে রাজ্য সরকারের অ্যাডভোকেট জেনারেল সুরজিৎ নাথ মিত্র পাল্টা যুক্তি দিয়ে আদালতে জানান, ওয়ার্ড বাড়াবার প্রশাসনিক খসড়া আগেই প্রকাশ করা হয়েছিল এবং সাধারণ মানুষের আপত্তি বা পরামর্শ জানানোর পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কেউ কোনও লিখিত আপত্তি জানাননি। আদালত দুই পক্ষের দীর্ঘ আইনি যুক্তি ও নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার পর স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে, ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত মূল মামলাটি এখনো সিঙ্গল বেঞ্চে বিচারাধীন রয়েছে। সুতরাং, সেই আইনি বিবাদের চূড়ান্ত মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত কোনোভাবেই কলকাতা পুরসভার নির্বাচনের নোটিফিকেশন বা সূচি প্রকাশ করা যাবে না। আদালতের এই রায়ে আপাতত রাজ্য নির্বাচন কমিশনের সমস্ত ভোটের প্রস্তুতিতে বড়সড় ব্রেক কষে গেল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *