স্যার অ্যালেক্সের ফোন থেকে ইউরো জয়—আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায় নিয়ে ৪১ বছর বয়সে কী ইঙ্গিত দিলেন ক্রিশ্চিয়ানো?

আন্তর্জাতিক ফুটবলের এক চিরস্মরণীয় অধ্যায়ের যবনিকা ঘটল। পর্তুগালের জাতীয় দলের জার্সি তুলে রাখার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করলেন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো (Cristiano Ronaldo)। ৪১ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড জানিয়ে দিয়েছেন, পর্তুগালের হয়ে তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার এখানেই শেষ। তবে বুট জোড়া তিনি এখনই তুলে রাখছেন না। আপাতত সৌদির ক্লাব আল-নাসরের (Al-Nassr) হয়ে মাঠ কাঁপানো জারি রাখবেন তিনি।
জাতীয় দল থেকে বিদায় নিলেও ফুটবল রূপকথায় নতুন ইতিহাস গড়াই এখন সিআরসেভেনের প্রধান লক্ষ্য। পেশাদার ক্যারিয়ারে অভূতপূর্ব ১,০০০ গোলের মাইলফলক ছোঁয়ার স্বপ্ন তাড়া করছেন তিনি। বর্তমানে তাঁর গোল সংখ্যা ৯৮৫। মহাজাগতিক এই ১,০০০ গোলের চূড়ায় পৌঁছাতে তাঁর প্রয়োজন আর মাত্র ১৫টি গোল। আন্তর্জাতিক ফুটবলের আলবিদা লগ্নে এক নজরে দেখে নেওয়া যাক স্পোর্টিং লিসবন, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, রিয়াল মাদ্রিদ ও জুভেন্টাসের হয়ে রোনালদোর সেই ১০টি অবিস্মরণীয় সময়, যা তাঁকে বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে অমর করে রেখেছে।
১. সেই কালজয়ী প্রীতি ম্যাচ ও স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন (২০০৩)
২০০৩ সালে প্রাক-মরশুম প্রীতি ম্যাচে স্পোর্টিং লিসবনের হয়ে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিরুদ্ধে ৩-১ ব্যবধানে জয় পায় রোনালদোর দল। সেদিন একা হাতে ইউনাইটেড রক্ষণকে তছনছ করে দুটি গোল করান ১৮ বছরের তরুণ রোনালদো। ম্যাচ শেষ হতেই ড্রেসিংরুমে এবং দেশে ফেরার বিমানে সতীর্থদের অনুরোধে ১ কোটি ২০ লক্ষ পাউন্ডের বিনিময়ে তাঁকে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে সই করান স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন। বাকিটা শুধুই ইতিহাস।
২. ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে প্রথম লিগ ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয় (২০০৭-০৮)
রেড ডেভিলসের হয়ে ২০০৬-০৭ মরশুমে প্রিমিয়ার লিগে ১৭টি গোল করে প্রথম লিগ ট্রফি এবং বর্ষসেরা তরুণের খেতাব জেতেন সিআরসেভেন। পরের মরশুমেই (২০০৭-০৮) ফাইনালে গোল করে জেতেন প্রথম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, সাথে পান জীবনের প্রথম ইউরোপীয় গোল্ডেন শু ও ব্যালন ডি’অর।
৩. প্রথম ফিফা পুসকাস পুরস্কার (২০০৯)
পোর্তোর বিরুদ্ধে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ম্যাচে ৪০ গজ দূর থেকে রকেট গতির এক শটে গোল করেছিলেন রোনালদো। অবিশ্বাস্য সেই গোলটির জন্য ফুটবল ইতিহাসের প্রথম ‘ফিফা পুসকাস পুরস্কার’ (Puskas Award) ওঠে তাঁর হাতে। ওই বছরই ৮০ মিলিয়ন পাউন্ডের বিশ্বরেকর্ড ট্রান্সফার ফি-তে তিনি যোগ দেন রিয়াল মাদ্রিদে।
৪. এল ক্লাসিকোয় কোপা দেল রে জয় (২০১১)
রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে প্রথম বড় ট্রফি আসে ২০১১ সালে। বার্সেলোনাকে হারিয়ে কোপা দেল রে ফাইনালের অতিরিক্ত সময়ে অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়ার ক্রস থেকে শূন্যে লাফিয়ে ট্রেডমার্ক হেডে জয়সূচক গোল করেন রোনালদো।
৫. রিয়াল মাদ্রিদের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা (২০১৫)
২০১৫ সালের অক্টোবরে লেভান্তের বিরুদ্ধে মাত্র ৩১০টি ম্যাচে নিজের ৩২৪তম গোলটি করে রাউলকে টপকে রিয়ালের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে যান তিনি। পরবর্তীতে রিয়ালের হয়ে ৪৩৮ ম্যাচে অবিশ্বাস্য ৪৫০টি গোল করার রেকর্ড গড়েন রোনালদো।
৬. পর্তুগালের হয়ে ঐতিহাসিক ইউরো জয় (২০১৬)
নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ১৬-র ইউরো কাপ। প্যারিসের ফাইনালে স্বাগতিক ফ্রান্সের বিরুদ্ধে খেলতে নেমে প্রথমার্ধেই চোট পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছাড়েন অধিনায়ক। কিন্তু টাচলাইনে দাঁড়িয়ে সাইডলাইন কোচের মতো দল পরিচালনা করে পর্তুগালকে ১-০ গোলে জেতান। ইউরোর ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১৪টি গোল করে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেন তিনি।
৭. পঞ্চম ব্যালন ডি’অর স্পর্শ (২০১৭)
২০১৬-১৭ মরশুমে রিয়ালকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও লা লিগা ডাবল এনে দিয়ে নিজের পঞ্চম ব্যালন ডি’অর (Ballon d’Or) জেতেন রোনালদো। জুভেন্টাসের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ফাইনালে দুটি গোল করেছিলেন তিনি।
৮. বায়ার্নের বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিক ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ১০০ গোল (২০১৭)
বায়ার্ন মিউনিখের বিরুদ্ধে কোয়ার্টার ফাইনালে এক দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক করে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে ১০০ গোলের ক্লাবে প্রবেশ করেন। ইউরোপের সেরা এই টুর্নামেন্টে ১৮৭ ম্যাচে ১৪১ গোলের এক অলৌকিক বিশ্বরেকর্ড ধরে রেখেছেন তিনি।
৯. জুভেন্টাসের বিরুদ্ধে সেই অভূতপূর্ব বাইসাইকেল কিক (২০১৮)
ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল! ২০১৮ চ্যাম্পিয়ন্স লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে জুভেন্টাসের বিপক্ষে শূন্যে ভাসমান অবস্থায় অ্যাক্রোব্যাটিক বাইসাইকেল কিকে গোল করেন। বিপক্ষ জুভেন্টাস সমর্থকরাও দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে অভিবাদন জানিয়েছিলেন রোনালদোকে।
১০. আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বকালের সেরা গোলদাতা (২০২১) ও ৯০০ গোলের মাইলফলক (২০২৪)
ইরানের আলি দাইয়ের ১০৯ গোলের বিশ্বরেকর্ড ভেঙে ২০২১ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবলে এককভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা হন সিআরসেভেন। পর্তুগালের হয়ে ২৩৪ ম্যাচে ১৪৬ গোল করে বিদায় নিলেন তিনি। আর ২০২৪ সালে ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে প্রথম ফুটবলার হিসেবে পেশাদার ফুটবলে অফিশিয়াল ৯০০ গোলের অবিশ্বাস্য মাইলফলক স্পর্শ করেন।
বর্তমানে ৯৮৫ গোলের মালিক রোনালদো। প্রতিপক্ষ লিওনেল মেসি (৯৩১ গোল) পেছনে তাড়া করলেও, সৌদির মাঠে ফুটবল রাজপুত্র ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর লক্ষ্য এখন একটাই—ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার হিসেবে দ্রুত ১,০০০ গোলের শৃঙ্গ জয় করা!