মহা-সাধক বামাক্ষ্যাপার অলৌকিক তেজ! জামুড়িয়ার ইকড়া গ্রামে আজ শতবর্ষ পরেও কেন অটুট এই রহস্যময় কাহিনি?

এক সাধারণ যাত্রীকে টিকিট না থাকায় মাঝরাস্তায় ট্রেন থেকে নামিয়ে দিয়েছিলেন ব্রিটিশ রেলকর্মীরা। কিন্তু তারপর যা ঘটেছিল, তা ইতিহাসের পাতায় বা আধুনিক বিজ্ঞানের যুক্তিতে মেলা কঠিন। ১৯ শতকের সেই অভাবনীয় ঘটনা আজও লোকমুখে এক অলৌকিক ও জীবন্ত অধ্যায় হয়ে বেঁচে রয়েছে আসানসোল-জামুড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী ইকড়া গ্রামে।

এটি কোনো রটনা বা কল্পকাহিনি নয়; এই ঘটনা এবং সমগ্র ইকড়া গ্রামের নামের সাথে চিরতরে জড়িয়ে রয়েছে তারা মায়ের পরম সাধক বামাক্ষ্যাপার (বামদেব) পুণ্য স্মৃতি। বিশেষ করে কালীপুজোর প্রাক্কালে সেই ১০০ বছরের প্রাচীন অলৌকিক কাহিনি ঘিরেই নতুন করে তোলপাড় আর চর্চা শুরু হয়েছে শিল্পাঞ্চলের এই জনপদে।

অন্ডাল থেকে যাত্রা: সাধুকে নামাতেই থমকে গেল ট্রেন!

স্থানীয় প্রবীণদের মুখে মুখে ফেরা জনশ্রুতি অনুযায়ী, একবার অন্ডাল স্টেশন থেকে বৈজনাথ ধামের (বৈদ্যনাথ ধাম) উদ্দেশ্যে রেলপথে রওনা দিয়েছিলেন তারাচরণের মানসপুত্ৰ সাধক বামাক্ষ্যাপা। কিন্তু সাধু মানুষ, তাঁর কাছে ছিল না কোনো রেল টিকিট। ব্রিটিশ আমলের কড়া রেলকর্মীরা তাঁকে টিকিটহীন দেখে জামুড়িয়ার ইকড়া স্টেশনের কাছে নামিয়ে দেন।

বিনা বাক্যে ট্রেন থেকে নেমে প্রখ্যাত সাধক পায়ে হেঁটে ঘন জঙ্গলের ভেতরে মিলিয়ে যান। কিন্তু আসল অলৌকিক ঘটনা ঘটে ঠিক এর পরেই। চালক কয়লার ইঞ্জিন চালু করলেও এক চুলও নড়ল না ট্রেনের চাকা! নানাভাবে চেষ্টা চালিয়ে, যন্ত্রাংশ পরীক্ষা করেও ব্যর্থ হন ব্রিটিশ প্রকৌশলীরা।

ট্রেন কোনোভাবেই চালানো সম্ভব না হওয়ায় রেলকর্মীদের মনে প্রবল সন্দেহ তৈরি হয়—যাঁকে অবহেলা করে নামিয়ে দেওয়া হলো, তিনি কি তবে সাধারণ কোনো মানুষ নন? শুরু হয় জঙ্গলজুড়ে তাঁকে খোঁজার পালা।

জঙ্গলে ধ্যানমগ্ন বামদেব, ক্ষমা চাইতেই সচল চাকা!

অবশেষে ইকড়া গ্রামের প্রান্তে গভীর অরণ্যের ভেতরে ধ্যানমগ্ন অবস্থায় দেখা মেলে সাধক বামাক্ষ্যাপার। রেলকর্মীরা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে তাঁর চরণে লুটিয়ে পড়েন এবং কৃপা প্রার্থনা করেন। কথিত আছে, সাধক বামদেব হাসিমুখে সম্মতি জানিয়ে আশীর্বাদ করতেই মুহূর্তে চালকের আসনে থাকা ব্রিটিশদের থমকে যাওয়া ট্রেন সচল হয়ে ওঠে।

চারবার এসেছিলেন গ্রামে, সাধনার আসন আজও জাগ্রত

ইকড়া গ্রামের সাথে সাধক বামাক্ষ্যাপার এই গাঢ় আধ্যাত্মিক যোগসূত্র তৈরি হয়েছিল তাঁর প্রধান ও অন্যতম প্রিয় শিষ্য ঋষিকেশ চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরে। গ্রামের জমিদার ঋষিকেশবাবুর বিশেষ আমন্ত্রণে বামদেব মোট চারবার ইকড়ায় এসেছিলেন।

  • রোগমুক্তি ও অলৌকিক রূপ: কথিত রয়েছে, একবার ইকড়া গ্রামে মড়ক রূপ নিয়ে মারাত্মক কলেরা রোগ ছড়িয়ে পড়েছিল। দিশেহারা ঋষিকেশ চট্টোপাধ্যায় গুরু বামদেবকে গ্রামে এনে সবার জন্য প্রার্থনা করতে অনুরোধ জানান। আশ্চর্যজনকভাবে, সাধক বামদেব গ্রামে পা রাখার পর থেকেই অলৌকিকভাবে দূর হতে শুরু করে কলেরার দাপট।

  • আজও পুজো হয় সাধনার আসনে: ইকড়ার মহিষাবুড়ি এলাকায় ট্রেন থেকে নেমে যে ঘন জঙ্গলাকীর্ণ স্থানে তিনি তপস্যায় বসেছিলেন, পরবর্তীতে সেখানে গড়ে ওঠে একটি স্থায়ী বামদেব মন্দির। বর্তমানেও সেখানে প্রতিদিন সাড়ম্বরে নিত্যপুজো হয়।

ঋষিকেশ চট্টোপাধ্যায়ের নাতি চিত্তরঞ্জন চট্টোপাধ্যায় স্মৃতিচারণ করে জানান, “বামদেব কেবল মহিষাবুড়িতেই সাধনা করেননি, আমাদের বাসন্তী মন্দিরেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতেন। আমাদের পরিবারে তাঁর অজস্র স্মৃতি রয়েছে। বামদেবের প্রয়াণের পর গুরুর স্মৃতিরক্ষায় দাদু ঋষিকেশ চট্টোপাধ্যায় নিজের ব্যক্তিগত জমি দান করে তারাপীঠে বামদেবের সমাধিক্ষেত্র নির্মাণের ব্যবস্থা করেছিলেন।”

তারাপীঠের সাথে নাড়ির টান ও কালীপুজোর মেগা আয়োজন

তারাপীঠ আর জামুড়িয়ার ইকড়া—এই দুই পুণ্যভূমিকে আধ্যাত্মিক এক সুতোয় গেঁথে রেখেছেন সাধক বামাক্ষ্যাপা ও তাঁর শিষ্যের অমলিন অবদান। তারাপীঠে তারা মায়ের সেবার জন্য জমি দেওয়া থেকে শুরু করে বামদেবের মূল সমাধিক্ষেত্রে আজও খোদাই করা রয়েছে জমিদার ঋষিকেশ চট্টোপাধ্যায়ের নাম।

ইকড়ার শ্রী শ্রী বামদেব মন্দিরে সারাবছর সাধকদের আনাগোনা থাকলেও কালীপুজোর দিনে বিশেষ আড়ম্বর দেখা যায়। মন্দিরের প্রধান সেবাইত সুশীল চট্টোপাধ্যায় জানান, এই বিশেষ দিনে তান্ত্রিক রীতি মেনে পুজো ও প্রথা অনুযায়ী বলিদানের নিয়ম রয়েছে। হাজার হাজার ভক্তের জন্য প্রসাদ ও অন্নভোগের ব্যবস্থা করা হয়। কালীপুজোর এই পুণ্য লগ্নে বামাক্ষ্যাপার স্মৃতিধন্য ইকড়া গ্রামের অলৌকিক ইতিহাসের টান আজও দেশ-বিদেশের অগণিত পুণ্যার্থীকে চুম্বকের মতো টেনে আনছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *