২০২৯-এর মধ্যে ৩ লক্ষ কোটির লক্ষ্য! সামরিক ক্ষেত্রে মোদী সরকারের মহাপরিকল্পনা নিয়ে বড় ঘোষণা রাজনাথের

একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক রণকৌশলে সামরিক দিক থেকে প্রস্তুত থাকতে হলে প্রতিরক্ষা খাতে দেশীয় উৎপাদন এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিতে আত্মনির্ভরতা অর্জনের কোনো বিকল্প নেই। ভারতে নিজস্ব প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরি, তার রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলোতে দ্রুত পরিবর্তন আনার পূর্ণ সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। সম্প্রতি আয়োজিত ‘দিল্লি ডিফেন্স ডায়ালগ ২০২৬’-এর মঞ্চে দাঁড়িয়ে এই দূরদর্শী বার্তাই দিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং।

তিনি স্পষ্ট করে জানান, আত্মনির্ভরশীলতার অর্থ বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা নয়; বরং বৈশ্বিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে নিজেদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়িয়ে আরও শক্তিশালী অংশীদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করাই এর প্রকৃত উদ্দেশ্য।

২০৪৭-এর ‘বিকশিত ভারত’ এবং প্রতিরক্ষা খাতের চার স্তম্ভ
প্রতিরক্ষামন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সংস্কার, প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরশীলতা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং প্রতিরক্ষা রপ্তানি—এই চারটি বিষয় মূলত একে অপরের পরিপূরক। ২০৪৭ সালের মধ্যে ‘বিকশিত ভারত’-এর জাতীয় লক্ষ্য অর্জনে এই চার স্তম্ভ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

রাজনাথ সিংয়ের মতে, অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক সংস্কার সামরিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে, আত্মনির্ভরতা দেশীয় প্রযুক্তির বিস্তার ঘটাবে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আমাদের আধুনিক প্রযুক্তির কাছাকাছি নিয়ে যাবে এবং বিশ্ববাজারে ভারতীয় কোম্পানিগুলোর আধিপত্য তৈরি করবে প্রতিরক্ষা রপ্তানি।

বদলাচ্ছে যুদ্ধের রূপ: ড্রোন ও ডিজিটাল চ্যালেঞ্জ
যুদ্ধের ঐতিহ্যবাহী সংজ্ঞা যে দ্রুত বদলে যাচ্ছে, সে কথা স্মরণ করিয়ে দেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। সাম্প্রতিক বিশ্বজুড়ে চলা সংঘাতের উদাহরণ টেনে তিনি জানান, যুদ্ধ এখন আর কেবল স্থল, সমুদ্র বা আকাশসীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তা ছড়িয়ে পড়েছে মহাকাশ, সাইবার স্পেস এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ডিজিটাল ক্ষেত্র পর্যন্ত।

বর্তমানে কম খরচের ড্রোন ও স্বয়ংক্রিয় সামরিক ব্যবস্থাগুলি অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল প্রতিরক্ষা প্ল্যাটফর্মগুলোর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে দ্রুত নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা, উৎপাদনের গতি বাড়ানো এবং যুদ্ধকালীন জরুরি অবস্থায় অস্ত্রের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন ভারতের মূল অগ্রাধিকার।

মেগা প্রকল্পে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ ও পুনর্গঠন
প্রতিরক্ষা উৎপাদনে বেসরকারি সংস্থাগুলোর অংশগ্রহণ আরও বাড়ানোর ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী।

মূল প্রকল্পসমূহ: এএমসিএ (AMCA) যুদ্ধবিমান নির্মাণ, প্রপালশন সিস্টেম, এটিএজিএস (ATAGS) কামান, উন্নত আর্টিলারি গোলাবারুদ এবং আধুনিক যুদ্ধজাহাজ তৈরির মতো উচ্চ প্রযুক্তির কর্মসূচিতে বেসকারি সংস্থাকে যুক্ত করার কথা বলেছেন তিনি।

কাঠামোগত পরিবর্তন: দেশের প্রতিরক্ষা শিল্প করিডোর স্থাপন এবং পুরোনো অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরি বোর্ডকে পুনর্গঠিত করে সাতটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে (DPSUs) রূপান্তর করার ফলে ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদন ব্যবস্থা বহুগুণ শক্তিশালী হয়েছে। এর সরাসরি সুবিধা পাচ্ছে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (MSMEs), স্টার্টআপ এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান।

রেকর্ডের মুখে প্রতিরক্ষা উৎপাদন ও রপ্তানি
প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় সরকার ২০২৫ সালকে ‘সংস্কারের বছর’ হিসেবে উদযাপিত করেছিল, যার সরাসরি ফল মিলছে বর্তমান অর্থবর্ষে।

রেকর্ড উৎপাদন: ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারতের মোট প্রতিরক্ষা উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১.৭৮ লক্ষ কোটি টাকা।

রপ্তানিতে জোয়ার: ভারতীয় প্রতিরক্ষা রপ্তানি এক লাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮,৪২৪ কোটি টাকায়।

আন্তর্জাতিক বাজার: বর্তমানে বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশে পৌঁছে যাচ্ছে ভারতে তৈরি সামরিক সরঞ্জাম।

সরকারের আগামী দিনের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে রাজনাথ সিং বলেন, আগামী ২০২৯ সালের মধ্যে দেশের প্রতিরক্ষা উৎপাদনের পরিমাণকে ৩ লক্ষ কোটি টাকা এবং প্রতিরক্ষা রপ্তানিকে ৫০ হাজার কোটি টাকার আন্তর্জাতিক মাইলফলকে পৌঁছে দেওয়াই কেন্দ্রীয় সরকারের মূল লক্ষ্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *