শ্রীকৃষ্ণকে ‘অপমান’ থেকে ৩০ কোটির সাম্রাজ্য! বিতর্কিত বাগেশ্বর বাবা আদতে কে? জানুন তাঁর আসল রূপ

কখনও দুর্গাপূজায় বাঙালিদের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে কটূক্তি, তো কখনও ভগবান শ্রীরাম ও শ্রীকৃষ্ণের তুলনা টেনে ঈশ্বরকে ‘অপমান’! একের পর এক বিতর্ক যেন পিছু ছাড়ছে না বাগেশ্বর ধামের প্রধান ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর। তবে চরম বিরোধিতার মুখে পড়ে বারবার ক্ষমা চাইলেও তাঁর অলৌকিক দাবি ও নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে রাজনৈতিক অলিন্দ থেকে সোশ্যাল মিডিয়া— সর্বত্রই শোরগোল তুঙ্গে।
কিন্তু বিতর্ক যাঁর নিত্যসঙ্গী, সেই ‘বাগেশ্বর বাবা’ আদতে কে? কীভাবে এক চরম দরিদ্র পরিবারের ছেলে আজ দেশের অন্যতম চর্চিত ও ধনকুবের ‘ধর্মগুরু’ হয়ে উঠলেন? জেনে নিন তাঁর শৈশব থেকে খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছানোর অজানা কাহিনি।
দারিদ্র্যে মোড়ানো শৈশব ও আধ্যাত্মিকতার পথচলা
বর্তমানে ৩০ বছর বয়সী বাগেশ্বর বাবার আসল নাম ধীরেন্দ্র শাস্ত্রী। মধ্যপ্রদেশের ছাতারপুর জেলার গাদা গ্রামে এক অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে তাঁর জন্ম। বাবা রামকৃপাল গর্গ পেশায় সামান্য পুরোহিত ছিলেন, মা সরোজ গর্গ গৃহবধূ। ভাঙা কুঁড়েঘরে অনাহারে-অর্ধাহারে কেটেছে তাঁর ছেলেবেলা।
বাগেশ্বর ধামের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ছোটবেলায় এক প্রবল বৃষ্টির রাতে ঘরে খাবার না থাকায় খাটের তলায় আশ্রয় নিতে হয়েছিল পরিবারকে। স্বজনদের সেই অসহনীয় কষ্ট দেখেই ধীরেন্দ্রর জীবনে আসে বড় মোড়। তাঁর দাদু একটি হনুমান মন্দিরে থাকতেন। পরের দিনই দাদুর কাছে চলে যান এবং সেখান থেকেই আধ্যাত্মিক জীবনের পথে পা বাড়ান তিনি।
গল্প বলা থেকে ‘দৈব দরবার’ ও গদাধারী পরিচয়
ছোটবেলা থেকেই ছড়াকাটা ও গল্প শোনানোর অসাধারণ দক্ষতা ছিল ধীরেন্দ্রর। নির্মোহী আখড়ার হনুমান মন্দিরের সামনে সভা বসিয়ে ‘রামচরিতমানস’ পাঠ করতেন তিনি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু করেন তাঁর আলোচিত ‘দৈব দরবার’। ভক্তদের বিশ্বাস করাতে শুরু করেন যে, তাঁর মধ্যে বিশেষ ‘অলৌকিক ক্ষমতা’ রয়েছে। মাথায় পাগড়ি এবং হাতে ছোট গদা নিয়ে হাজির হওয়া এই তরুণ দেখতে দেখতে সাধারণ ধীরেন্দ্র থেকে হয়ে ওঠেন স্বঘোষিত ‘বাগেশ্বর বাবা’। আজ শুধু ভারত নয়, বিদেশও ছড়িয়ে রয়েছে তাঁর অগুনতি ভক্ত।
সামাজিক উন্নয়ন বনাম অলৌকিকত্বের বিতর্ক
বাগেশ্বর ধামের তরফে একাধিক সমাজসেবামূলক কাজ চালানো হয়। যেমন—
-
গরিবের বিনামূল্যে খাদ্য বিতরণ এবং অসহায় পরিবারের কন্যাদের গণবিবাহের ব্যবস্থা।
-
ক্যান্সার আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য ছাতারপুরে তৈরি হচ্ছে বিশাল দাতব্য হাসপাতাল, যার শিলান্যাস করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠে তাঁর বিরুদ্ধে অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার ছড়ানোর গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মন্ত্রপাঠ ও আশীর্বাদের মাধ্যমে মারণরোগ সারানোর দাবি তোলায় বিজ্ঞানমঞ্চ ও প্রগতিশীল সংস্থাগুলি বারবার তাঁর বিরুদ্ধে সরব হয়েছে।
আড়াই লাখি পারিশ্রমিক ও ৩০ কোটির সাম্রাজ্য!
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাধারণ মানুষের দারিদ্র্য দূর করার কথা বললেও বাগেশ্বর বাবার নিজের আর্থিক সাম্রাজ্য চমকে দেওয়ার মতো। প্রতিটি ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক অনুষ্ঠান থেকে তিনি প্রায় আড়াই থেকে সাড়ে তিন লক্ষ টাকা পারিশ্রমিক নেন। সূত্রের খবর, বর্তমানে তাঁর মোট সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ৩০ কোটি টাকা!
শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের পর আইনি কোপ ও জনরোষ এড়াতে তিনি ক্ষোভে জল ঢালার চেষ্টা করলেও, ‘বাগেশ্বর বাবা’র সত্যতা ও অলৌকিক দাবি নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন কিন্তু থেকেই যাচ্ছে।