৮৩ বিলিয়ন ডলার খরচ করেও ড্রোন হামলার মুখে রিয়াদ! আকাশছোঁয়া সামরিক শক্তি নিয়েও কেন হুথিদের সামনে কোণঠাসা সৌদি আরব?

বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ এবং সামরিক অস্ত্রভাণ্ডারে সবথেকে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলির একটি সৌদি আরব। ২০২৩ সালে প্রায় ৮৩ বিলিয়ন ডলার প্রতিরক্ষা খাতে খরচ করে দেশটি বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম সামরিক ব্যয়কারী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি (Houthi) বিদ্রোহীদের ছোঁড়া একটির পর একটি মিসাইল ও ড্রোন হামলার সামনে কার্যত অসহায় রিয়াদ। আধুনিক প্রযুক্তির রমরমা সত্ত্বেও প্রচলিত সামরিক শক্তির এই ভরাডুবি কেন? সম্প্রতি প্রখ্যাত অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘ফোর্বস’ (Forbes)-এ প্রকাশিত এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাতাশা লিন্ডস্টেডট (Natasha Lindstaedt)-এর একটি বিশ্লেষণে এই চাঞ্চল্যকর তথ্যগুলো সামনে এসেছে।

সৌদির ওপর হুথিদের মারাত্মক হামলা:
ফোর্বসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদির বিরুদ্ধে হুথিদের আক্রমণ সম্প্রতি এক নতুন মাত্রা নিয়েছে। রাজধানী রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক সপ্তাহে তিনটি মারাত্মক হামলার ঘটনা ঘটেছে, যাতে ১২ জন নিহত এবং ৩০০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন। পাশাপাশি একটি জ্বালানি সঞ্চয় বা ফুয়েল ডিপোতেও আঘাত হেনেছে বিদ্রোহীরা। এমনকি হুথিরা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, মদিনা ও মক্কা ছাড়া সৌদি আরবের অন্য কোনো বিমানবন্দর যাতে কোনো বিমান ব্যবহার না করে। এই হামলার ফলে শুধু প্রাণহানিই নয়, চরম বিপর্যস্ত হয়েছে সৌদির এভিয়েশন ও আর্থিক বাজারও। বৃহস্পতিবার নির্ধারিত উড়ানের ৭০ শতাংশই বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে সৌদি আরব, যার জেরে সৌদির স্টক এক্সচেঞ্জও প্রায় দুই শতাংশ ধসে পড়েছে।

সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব থাকা সত্ত্বেও কেন ব্যর্থ সৌদি আরব?
সৌদি আরবের অস্ত্রাগারে রয়েছে আমেরিকার তৈরি অত্যাধুনিক এফ-১৫ ফাইটার জেট, ইউরোরফাইটার টাইফুন এবং প্যাট্রিয়ট ও থাড (THAAD) মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমের মতো বিধ্বংসী অস্ত্র। তা সত্ত্বেও কেন তারা হুথিদের দমাতে পারছে না?

অধ্যাপক লিন্ডস্টেডটের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হুথিদের কোনো যুদ্ধ জেতার প্রয়োজন নেই; তারা মূলত প্রতিসাম্যহীন বা ‘অ্যাসাইমেট্রিক ওয়ারফেয়ার’ (Asymmetric Warfare)-এর কৌশল অবলম্বন করেছে, যার উদ্দেশ্য ধীরে ধীরে সৌদির ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ বাড়িয়ে যাওয়া। হুথিরা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ব্যালেস্টিক ও ক্রুজ মিসাইল এবং দীর্ঘপাল্লার ড্রোন ব্যবহার করছে। তাদের কোনো বিশাল বিমান বাহিনী বা কাঠামোগত সামরিক পরিকাঠামোর প্রয়োজন হয় না।

পাশাপাশি, সৌদি সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ কিছু কাঠামোগত দুর্বলতাও এর জন্য দায়ী। রাজপরিবারের ক্ষমতা সুরক্ষিত রাখতে এবং অভ্যুত্থান রুখতে সৌদি আরব তাদের সামরিক বাহিনীকে বিভিন্ন ভাগে (যেমন ন্যাশনাল গার্ড, রয়্যাল গার্ড ইত্যাদি) বিভক্ত করে রেখেছে। এর জেরে বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং পারস্পরিক সমন্বয়ের অভাব দেখা দেয়, যা হুথিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া ইয়েমেনের দীর্ঘ সংঘাতে লড়াই করার মাধ্যমে হুথিরা যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তার ধারেকাছেও নেই সৌদি সেনারা।

ইরানের মদদ ও ক্রাউন প্রিন্সের ভিশন ২০৩০-এর ধাক্কা:
গত ২০০৯ সাল থেকে ইরান যেভাবে হুথিদের অস্ত্রাংশ চোরাচালান, প্রশিক্ষণ এবং সামরিক উপদেষ্টা পাঠিয়ে সাহায্য করে আসছে, তাতে তাদের শক্তি বহুগুণ বেড়ে গেছে। এর ওপর আবার সৌদি আরবের আঞ্চলিক মিত্রদের অবস্থানও দুর্বল হয়েছে। সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাতের ইয়েমেন থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর একা হয়ে পড়েছে রিয়াদ।

সবথেকে বড় কথা, এই সংঘাতের আঁচ কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই। সৌদি যুবরাজ মহম্মদ বিন সালমানের উচ্চাভিলাষী ‘ভিশন ২০৩০’ (Vision 2030) প্রোগ্রামের মূল লক্ষ্য হলো দেশের অর্থনীতিকে তেলনির্ভরতা থেকে মুক্ত করা, পর্যটন ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা। কিন্তু কৌশলগত স্থানগুলোতে লাগাতার এই আক্রমণ সৌদির ‘নিরাপদ গন্তব্য’ হিসেবে তৈরি হওয়া ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, কেবল দামি ও আধুনিক অস্ত্র কিনে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন নিখুঁত গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং অ্যাসাইমেট্রিক যুদ্ধের মোকাবিলা করার উপযুক্ত কৌশল।

Saheli Saha
  • Saheli Saha

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *