চীনের ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বাজারে ভারতের সার্জিক্যাল স্ট্রাইক! শি জিনপিংয়ের লালফৌজকে কাঁপাতে মোদী সরকারের মাস্টারপ্ল্যান

বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য ক্ষেত্রে প্রভাব বজায় রাখতে ভারত এবার চীনের বিরুদ্ধে নিজস্ব কৌশল আরও শানিত করতে শুরু করেছে। চীনের বাজারে ভারতীয় পরিষেবা রপ্তানিকারকদের পদে পদে যেসব বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে, তার একটি সুনির্দিষ্ট ও বিশদ তালিকা প্রস্তুত করা শুরু করেছে কেন্দ্রীয় বাণিজ্য বিভাগ। চীনে পণ্য ও সেবা উভয় ক্ষেত্রেই ভারতীয় সংস্থাগুলোর ক্ষেত্রে কঠোর লাইসেন্সিং নিয়মাবলি, নিবন্ধনের জটিলতা, ডেটা স্থানীয়করণ আইন এবং স্থানীয় প্রশাসনের অন্যায় চাপের মতো বাণিজ্য বাধাগুলোকে চিহ্নিত করাই এই মুহূর্তে দিল্লির মূল লক্ষ্য।
ইকোনমিক টাইমসের এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনা বাজারের জটিল ফাঁদ কেটে ভারতীয় সংস্থাগুলোর পথ সুগম করতেই কেন্দ্রের এই নজিরবিহীন পদক্ষেপ।
চীনের বিশাল বাজারে ভারতের অবস্থান ঠিক কোথায়?
পরিসংখ্যান বলছে, চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পরিষেবা আমদানিকারক দেশ। তারা প্রতি বছর বিশ্ববাজার থেকে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পরিষেবা আমদানি করে থাকে। কিন্তু সেই সুবিশাল অঙ্কের তুলনায় চীনের বাজারে ভারতের দখল একেবারেই নগণ্য। তথ্য অনুযায়ী, বিগত ২০২৪ সালে ভারত চীনে মাত্র ৮.৯৫ বিলিয়ন ডলারের পরিষেবা রপ্তানি করতে পেরেছিল।
তথ্য প্রযুক্তি (IT), ডিজিটাল সমাধান এবং প্রযুক্তিভিত্তিক পরিষেবা খাতের মতো জায়গায় বৈশ্বিক স্তরে ভারতের দাপুটে উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও, বেইজিংয়ের কঠোর ও বৈষম্যমূলক নিয়মের কারণে ভারতীয় সংস্থাগুলি নিজেদের আসল ক্ষমতা প্রদর্শন করতে পারছে না। ফলে বিশাল চীনা বাজারের একটা ক্ষুদ্রতম অংশেই আটকে রয়েছে ভারত।
চীনে ভারতীয় সংস্থাগুলির মূল প্রতিবন্ধকতা কী কী?
চীনে সরাসরি ব্যবসা বা পরিষেবা প্রদান করতে গিয়ে ভারতীয় কোম্পানিগুলোকে নানাবিধ আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার মুখে পড়তে হয়। বাণিজ্য বিভাগ ইতিমধ্যেই এই নিয়ে শিল্পখাতগুলির কাছ থেকে বিশদ রিপোর্ট চেয়ে পাঠিয়েছে। বাধাগুলির মূল তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
কঠোর ডেটা ও সাইবার আইন: চীনের ডেটা স্থানীয়করণ, সাইবার নিরাপত্তা প্রোটোকল এবং সীমান্ত পার ডেটা স্থানান্তরের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কড়া ও জটিল নিয়মকানুন।
ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিটের জট: ভারতীয় দক্ষ কর্মীদের জন্য ভিসা পেতে চরম বিলম্ব, জটিল ওয়ার্ক পারমিটের নিয়মাবলি এবং ভারতীয় পেশাগত যোগ্যতার প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির অভাব।
আর্থিক ও আইনি বৈষম্য: কর কাঠামো, আন্তর্জাতিক অর্থপ্রদান ও রেমিটেন্স প্রক্রিয়াকরণ এবং চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভারতীয় সংস্থাগুলোর ওপর অন্যায্য বৈষম্য তৈরি করা।
চীনা বাধার মুখে যেভাবে কাজ করছে ভারতীয় কোম্পানিগুলো
শিল্প প্রতিনিধিদের তথ্য অনুযায়ী, বাধা সত্ত্বেও চীনে ভারতীয় কোম্পানিগুলো একেবারে হাত গুটিয়ে বসে নেই। তবে বেইজিংয়ের সরাসরি বাধার কারণে ভারতীয় সংস্থাগুলো সরাসরি চীনা গ্রাহকদের পরিষেবা দিতে পারে না। এর পরিবর্তে, তারা মাঝের কোনো তৃতীয় পক্ষ বা অন্যান্য এজেন্সির হয়ে মূল গ্রাহকের কাজ সম্পন্ন করে থাকে।
বাণিজ্য বিভাগ এখন চীনে সক্রিয় এই সংস্থাগুলির কাছে কীভাবে তারা ভার্চুয়াল বা ছদ্ম উপায়ে ডেলিভারি দিচ্ছে এবং তাদের মালিকানা, স্থানীয় অংশীদারিত্ব ও পরিচালন ব্যবস্থা ঠিক কী রূপ নিচ্ছে, সেই সংক্রান্ত সম্পূর্ণ রিপোর্ট চেয়েছে।
বিশ্ব বাজারে আমেরিকা-যুক্তরাজ্যকে টেক্কা দিয়ে ভারতের উত্থান
বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক পরিষেবা রপ্তানির ক্ষেত্রে এখনও শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে আমেরিকা ও যুক্তরাজ্য। কিন্তু বিগত এক দশকে বিশ্বমঞ্চে ভারতের গ্রাফ যে হারে ঊর্ধ্বমুখী, তা নজর কেড়েছে অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের। ২০১৪ সালে বৈশ্বিক পরিষেবা রপ্তানিতে ভারতের অংশ যেখানে ছিল মাত্র ৩ শতাংশ, ২০২৪ সালে তা লাফিয়ে ৪.৩ শতাংশে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, এই একই সময়ে চীনের অংশ ৪.২ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৫.১ শতাংশ।
কোভিড মহামারী পরবর্তী সময়ে ভারতীয় প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা ও ডিজিটাল পরিষেবার বৈশ্বিক চাহিদা অভূতপূর্ব হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ভারত সরকারের এই নতুন কৌশল চীনে ভারতীয় সংস্থাগুলোর দরজা পুরোপুরি খুলে দিলে বেইজিংয়ের বাজারও যে এবার দিল্লির নিয়ন্ত্রণে আসবে, তা বলাই বাহুল্য।