মৃতদেহ পেল না পরিবার, গঙ্গার চরে কুশ দিয়ে তৈরি হলো পুতুল! দুই বন্ধুর মর্মান্তিক পরিণতি দেখে কেঁদে উঠবে মন

গঙ্গার তীব্র ও ভয়ংকর স্রোত কেড়ে নিল দুই জাঁকিয়ান তরুণের প্রাণ। বিহারের বেগুসরাইয়ের গরহারা গোধিয়ারি টোলার দুই বন্ধু অঙ্কিত কুমার (২০) এবং শিবম কুমার (১৯) দেশসেবার ব্রত নিয়ে সেনাবাহিনী ও পুলিশে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু জিিউতিয়া উৎসবের সকালে সিমারিয়া ভোলা ঘাটে গঙ্গার জলে স্নান করতে নেমে প্রবল স্রোতে ভেসে যান দুজনেই। দীর্ঘ সাত দিন ধরে শত চেষ্টা করেও দুই বন্ধুর মরদেহ খুঁজে না পাওয়ায় অবশেষে সনাতন প্রথা মেনে কুশের পুতুল তৈরি করে তাদের শেষকৃত্য সম্পন্ন করেছে শোকস্তব্ধ পরিবার। এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় গোটা এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।

বন্ধুত্ব ও অটল দেশসেবার স্বপ্ন:
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাম প্রতাপ সাহনির একমাত্র পুত্র অঙ্কিত এবং তার বাড়ি থেকে মাত্র একশো মিটার দূরে বসবাসকারী বিরজু রামের পুত্র শিবমের বন্ধুত্ব গোটা এলাকায় প্রবাদের মতো ছিল। তেয়াই কলেজের বিএ দ্বিতীয় বর্ষের এই দুই যুবক গত দুই বছর ধরে প্রতিদিন ভোরবেলা গঙ্গার তীরে কঠোর শরীরচর্চা করতেন। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হলেও কঠোর পরিশ্রমে নিজেদের ভাগ্য বদলানোর স্বপ্ন দেখতেন তারা। অঙ্কিত ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র উপার্জনকারী এবং শিবম ছিলেন ভাইবোনদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ।

যেভাবে ঘটল মর্মান্তিক দুর্ঘটনা:
জিউতিয়া উৎসবের সকালে সাইকেলে করে সিমারিয়া ভোলা ঘাটে পৌঁছেছিলেন দুই বন্ধু। ব্যায়াম ও দৌড়ঝাঁপের পর তারা গঙ্গায় নামতেই গভীর জল ও প্রবল স্রোতের টানে তলিয়ে যেতে শুরু করেন। একজনকে বাঁচাতে গিয়ে অন্যজনও স্রোতের কবলে পড়েন। ঘাটে পড়ে থাকে তাদের সাইকেল, চপ্পল, জামাকাপড় এবং মোবাইল ফোন। পরবর্তীতে শিবমের ফোন থেকে মুম্বাইয়ে এক আত্মীয়ের কাছে খবর পৌঁছানোর পর পরিবারের সদস্যরা ঘাটে ছুটে আসেন।

প্রশাসনের বিরুদ্ধে চরম উদাসীনতার অভিযোগ:
পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার পরই তারা স্থানীয় প্রশাসনকে এনডিআরএফ (NDRF) দল পাঠানোর অনুরোধ জানালেও সিওয়ানে অন্য দুর্ঘটনার অজুহাত দেখিয়ে তা ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এসডিআরএফ-এর দলও সামান্য খোঁজাখুঁজির পর ফিরে যায়। বাধ্য হয়ে পরিবারের সদস্যরা নিজেদের খরচে নৌকা, ডুবুরি ও সার্চলাইটের ব্যবস্থা করেন। সিমারিয়া থেকে শুরু করে লক্ষীসরাই, মুঙ্গের, নবগাছিয়া ও ভাগলপুর পর্যন্ত শত শত কিলোমিটার গঙ্গার তীরে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও প্রিয়জনদের কোনো সন্ধান মেলেনি। এমনকি এই মর্মান্তিক ঘটনার পরও স্থানীয় প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা শোকার্ত পরিবারগুলির খোঁজ নিতে আসেননি।

কুশের প্রতিমা দাহ করে শেষকৃত্য:
সনাতন ধর্ম অনুযায়ী, জলে ডুবে মৃত্যুর পর সাত দিনের মধ্যে মৃতদেহ না মিললে ‘কুশ’ দিয়ে প্রতিমা তৈরি করে দাহ করার বিধান রয়েছে। সেই প্রথা মেনেই শুক্রবার জয়নগর গঙ্গা ঘাটে দুই বন্ধুর কুশের প্রতিমা নতুন পোশাকে সাজিয়ে চিতা প্রস্তুত করা হয়। কম্পিত হাতে অঙ্কিতের প্রতিমা দাহ করেন তার ছোট বোন দীপিকা এবং শিবমের প্রতিমা দাহ করেন তার ছোট ভাই অংশু কুমার। আগামী দিনে নখবল, একাদশী ও দ্বাদশীর মতো সমস্ত ধর্মীয় আচারও এই পদ্ধতিতেই সম্পন্ন হবে।

যে সংকীর্ণ রাস্তাগুলোতে প্রতিদিন সকালে দেশসেবার স্বপ্ন নিয়ে ঘাম ঝরাত অঙ্কিত ও শিবম, আজ সেই গোধিয়ারি টোলার অলিগলিতে কেবলই ভারী নীরবতা আর একরাশ নিঃশব্দ কান্না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *