পুজো ফুরোলেই মনে হয় ‘সাধ মিটিল না’? প্রবাসের মাটিতেও কীভাবে ধুমধামে ঘোরে বাঙালির প্রাণের উৎসব?

হিন্দুধর্মের অন্যতম প্রধান ও সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব বলতে প্রথমেই মাথায় আসে দুর্গোৎসবের কথা। ঐতিহ্যগতভাবে হিন্দু পঞ্জিকার সপ্তম মাস আশ্বিন মাসে এই উৎসবের সূচনা হলেও, এর আনন্দ এবং উন্মাদনা ছড়িয়ে থাকে গোটা শরৎকাল জুড়ে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, অসম সহ দেশের বিভিন্ন পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যে এই উৎসব ঘিরে যে উন্মাদনা তৈরি হয়, তার তুলনা মেলা ভার।

পৌরাণিক পটভূমি ও দেবীপক্ষের সূচনা:
পৌরাণিক আখ্যান অনুযায়ী, মহিষাসুর নামক মহিষ-রূপী অসুরের বিনাশের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে দুর্গাপুজোর ইতিহাস। মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্গত ‘দেবীমাহাত্ম্য’ গ্রন্থে এই কাহিনীর উল্লেখ পাওয়া যায়। দেবতাদের বিরুদ্ধে মহিষাসুরের জয়লাভ এবং তাঁর বরপ্রাপ্তির পর ত্রিমূর্তির (ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব) সম্মিলিত শক্তিতে সৃষ্টি হয়েছিল রণরঙ্গিণী দেবী দুর্গার। আর মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠ ও মহিষাসুরমর্দিনী শোনার সঙ্গে সঙ্গেই আপামর বাঙালির মনে বেজে ওঠে পুজোর ঘণ্টা। মাঠে মাঠে কাশফুলের দোলন আর শিউলি ফুলের গন্ধ জানান দেয়—মা এসে গিয়েছেন।

চতুর্থী থেকে বিজয়া—উৎসবের মেজাজ:
কলকাতা থেকে শুরু করে রাজ্যের মফস্বল কিংবা জেলা শহর—চতুর্থী ও পঞ্চমীর দিন থেকেই মণ্ডপগুলিতে মানুষের ঢল নামতে শুরু করে। দিন হোক বা রাত, নতুন পোশাকে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরে প্রতিমা দর্শন বাঙালির উৎসবের সবচেয়ে বড় অঙ্গ। কারও কাছে আনন্দ মানে জমজমাট ঠাকুর দেখা, কেউ ভিড় ঠেলে রাস্তায় হেঁটে আনন্দ পান, আবার কেউ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় মণ্ডপের কোণে কাটিয়ে দেন উৎসবের কটা দিন। আর এই কদিন ডায়েট ভুলে খিচুড়ি, লাবড়া, বেগুন ভাজা, চাটনি, পায়েস কিংবা রসগোল্লা-সন্দেশে জমে ওঠে বাঙালির ভুরিভোজ।

প্রবাসের মাটিতেও অটুট বাঙালিয়ানা:
দেশের সীমানা ছাড়িয়ে সুদূর দিল্লি, ব্যাঙ্গালোর, মুম্বই কিংবা হায়দরাবাদের মতো বড় বড় শহরেও প্রবাসী বাঙালিরা ক্লাব বা অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে ধুমধামে দুর্গাপুজোর আয়োজন করেন। মণ্ডপে গিয়ে অঞ্জলি দেওয়া, ঢাকের আওয়াজ আর প্রসাদ নেওয়ার মধ্যে দিয়েই তাঁরা মাতৃভূমির টান কিছুটা হলেও মেটানোর চেষ্টা করেন।

হায়দরাবাদের এক বিশিষ্ট বাঙালি ক্লাবের কালচারাল সেক্রেটারি তথা প্রবাসী বাঙালি রাহুল নন্দী এই প্রসঙ্গে বলেন, “প্রবাসের পুজো মানে শুধুই পুজো নয়, নিজেদের শিকড়কে ছুঁয়ে দেখা। হায়দরাবাদের মতো বহুভাষী শহরে যখন আমরা উৎসব করি, তখন মণ্ডপের আলোয় শুধু প্রতিমাই জ্বলে ওঠে না, তার সঙ্গে থাকে স্মৃতির গান, আড্ডা আর শৈশবের বাঙালিয়ানায় বেড়ে ওঠার গল্প। সংস্কৃতি কখনও আটকে থাকে না, নতুন প্রজন্মের মাধ্যমেই তা নতুন দিশা পায়।” পুজো ফুরোলেও বাঙালির মনের কোণে থেকে যায় একটাই দীর্ঘশ্বাস—’সাধ মিটিল না, আরও কিছুদিন যদি দুর্গোৎসবের আনন্দ উপভোগ করতে পারতাম!’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *