পুজোর মুখেও হাসি নেই তাঁতিদের মুখে! বিলুপ্তির পথে বাংলার ঐতিহ্যবাহী গামছা শিল্প, নেপথ্যে বড় কারণ!

বাঙালি জীবনের অতি পরিচিত দৃশ্য— কাঁধে বা গলায় ঝোলানো একটি তাজা লাল-সাদা বা নীল-সাদা সুতির গামছা। ধনী থেকে দরিদ্র, সমাজের সর্বস্তরের মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারে এই সূতি বস্ত্রের কদর চিরন্তন। শুধু নিত্যদিনের ব্যবহারই নয়, বিবাহ, অন্নপ্রাশন, উপনয়ন কিংবা আসন্ন দুর্গাপূজা, কালীপূজা ও জগদ্ধাত্রী পূজার মতো প্রতিটি ধর্মীয় ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে সুতির গামছা অপরিহার্য। আধুনিক যুগে রকমারি রঙিন তোয়ালে বা টাওয়েলের প্রচলন বাড়লেও, চটজলদি জল শুষে নেওয়া, সহজে বহনযোগ্যতা এবং স্বাচ্ছন্দের কারণে খাঁটি দেশি হস্তচালিত সুতির গামছার কোনো বিকল্প তৈরি হয়নি।

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, পুজোর ঠিক মুখে যখন বাজারে গামছার চড়া চাহিদা থাকার কথা, ঠিক তখনই নদিয়ার ঐতিহ্যবাহী হস্তচালিত তাঁত গামছা শিল্প নেমে এসেছে চরম অস্তিত্ব সংকটে।

কাঁচামালের আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি ও অসম প্রতিযোগিতা

নদিয়ার রানাঘাট সহ একাধিক অঞ্চলে হাজার হাজার পরিবার বহুকাল ধরে এই হস্তচালিত গামছা বুননের সঙ্গে যুক্ত। তবে বর্তমান বাজারে টিঁকে থাকা তাঁদের পক্ষে কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিল্পীদের অভিযোগ, গামছা তৈরির প্রধান উপাদান সূতির সুতোর দাম দিন দিন অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়ছে। তার ওপর যোগ হয়েছে বিদ্যুৎ ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জামের চড়া দাম।

একদিকে যখন বিশুদ্ধ সুতোর দাম আকাশছোঁয়া, অন্যদিকে বাজার ছেয়ে গিয়েছে পাওয়ারলুমে (Powerloom) তৈরি কৃত্রিম ও সস্তা পলিয়েস্টার মিশ্রিত গামছায়। যান্ত্রিক উপায়ে কম খরচে বিপুল পরিমাণ গামছা কম দামে বাজারে ছেড়ে দিচ্ছে বৃহৎ কারখানাগুলি। ফলে গুণমানের দিক থেকে সাধারণ মানুষ না বুঝে সেই সস্তা পলিয়েস্টার গামছার দিকে ঝুঁকে পড়ছেন, আর মারাত্মক মার খাচ্ছে হস্তচালিত হস্তশিল্পের তৈরি খাঁটি সুতির গামছা।

অমানবিক পরিশ্রম, তবুও জুটছে না ন্যূনতম মজুরি

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে এই গামছা বুনন পেশার সাথে যুক্ত প্রবীণ তাঁতশিল্পী কাঞ্চন বিশ্বাস ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে জানান, আগে শুধু রাজ্য জুড়েই নয়, আসাম, বিহার, ঝাড়খণ্ড সহ ভিনরাজ্যেও নদিয়ার এই হাতে বোনা গামছার বিপুল চাহিদা ছিল। মহাজনদের কাছে সারাবছর অর্ডারের ভিড় থাকত। কিন্তু এখন পরিস্থিতি এতটাই করুণ যে কারিগররা কাজ ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

তাঁতিদের বক্তব্য অনুযায়ী:

  • পরিশ্রমের তুলনায় নগণ্য আয়: ভোর থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত টানা একাধিক তাঁতের যন্ত্র চালিয়েও দিনে মাত্র ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা উপার্জন করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।

  • মহাজনদের অনীহা: কাঁচামালের চড়া দামের কারণে মহাজনেরাও আগের মতো অগ্রিম টাকা দিয়ে গামছা বানানোর অর্ডার দিচ্ছেন না।

  • ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বিমুখ: কম লাভ এবং অমানবিক পরিশ্রমের কারণে নতুন প্রজন্ম আর এই পূর্বপুরুষের ঐতিহ্যবাহী শিল্পে আসতে চাইছে না। বহু অভিজ্ঞ কারিগর এখন দিনমজুর বা নির্মাণ শ্রমিকের কাজে পাড়ি দিচ্ছেন।

“সুতোর দাম যেভাবে হু-হু করে বাড়ছে, তাতে আর হস্তচালিত তাঁতে গামছা বুনে সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না। বাজার সস্তা পাওয়ারলুমের কৃত্রিম গামছায় ভরে গেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ বোঝেন না যে সেই গামছায় আসল সুতির আরাম ও স্থায়িত্ব থাকে না।” — হতাশ কণ্ঠে জানালেন এক স্থানীয় কারিগর।

সরকারি সাহায্যের আর্জি তাঁতি সমাজের

যে ঐতিহ্যবাহী গামছা শিল্প বহু দশক ধরে শত শত পরিবারের পেট চালিয়েছে এবং বাঙালি সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে রয়েছে, তা আজ সুতোর চড়া দাম এবং যান্ত্রিক প্রতিযোগিতার ধাক্কায় ধুঁকছে। তাঁতশিল্পীদের স্পষ্ট বার্তা, যদি অনতিবিলম্বে সরকার থেকে সুতোয় ভতুর্কি দেওয়া না হয় বা হস্তচালিত তাঁতশিল্পকে বাঁচাতে বিশেষ অর্থনৈতিক প্যাকেজ না আনা হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে জাদুঘরে স্থান পাবে বাংলার এই ঐতিহাসিক ‘হস্তচালিত গামছা শিল্প’।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *