ডায়লগের জাদুতে মোড়া পাঁচ দশক! কোন ১০টি কালজয়ী সংলাপ অমর করে রাখল নানা পাটেকরকে?

ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু অভিনেতা আছেন যাঁদের কণ্ঠস্বর এবং সংলাপ বলার ভঙ্গি দর্শকদের মনে চিরকালের জন্য খোদাই হয়ে থাকে। এই তালিকায় সবার প্রথমে উঠে আসে নানা পাটেকরের নাম। তাঁর অভিনীত চরিত্র যেমন বৈচিত্র্যময় ছিল, তেমনই তাঁর মুখের প্রতিটি লাইন একেকটি কালজয়ী সৃষ্টি হয়ে উঠেছে। পর্দার বাইরে তাঁর সমাজসেবা বা কার্গিলের অবদান যেমন প্রশংসনীয়, তেমনই রুপোলি পর্দায় তাঁর অভিনয় শৈলী আজও অনুরাগীদের হৃদয়ে জীবন্ত। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক নানা পাটেকরের কেরিয়ারের এমন কিছু চলচ্চিত্র ও সংলাপ, যা তাঁকে ভারতীয় সিনে ইতিহাসের অন্যতম সেরা আসনে বসিয়েছে।

‘ক্রান্তিবীর’-এর সেই কালজয়ী মোনোলগ ও চিত্রনাট্যহীন ক্লাইম্যাক্স
নানা পাটেকরের ডায়লগ ডেলিভারির কথা উঠলেই সবার আগে মনে পড়ে ১৯৯৪ সালের ছবি ‘ক্রান্তিবীর’-এর কথা। ছবিতে প্রতাপ নারায়ণ তিলক চরিত্রে অভিনয় করে সমাজব্যবস্থার দুর্নীতি ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছিলেন তিনি। তাঁর সেই বিখ্যাত সংলাপ— “মুসলমান কা খুন, ইয়ে হিন্দু কা খুন…” আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে।

পাশাপাশি, “আ গয়ে মেরি মউত কা তমাশা দেখনে…” দিয়ে শুরু হওয়া সেই একক অভিনয় তাঁর কেরিয়ারের অন্যতম সেরা মুহূর্ত। মজার বিষয় হলো, ছবির ওই ক্লাইম্যাক্স দৃশ্যটি আগে থেকে কোনো প্রথাগত স্ক্রিপ্টে লেখা ছিল না। শুটিংয়ের সময় নানা পাটেকর স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজের আবেগকে ভাষা দিয়েছিলেন, যা ভারতীয় সিনেমার অন্যতম স্মরণীয় পারফরম্যান্স।

এক নজরে নানা পাটেকরের সেরা ১০ সংলাপ:
১. “এক মচ্ছর আদমি কো হিজরা বানা দেতা হ্যায়…” – যশওয়ান্ত (১৯৯৭)

২. “আ গয়ে মেরি মৌত কা তমাশা দেখনে…” – ক্রান্তিবীর (১৯৯৪)

৩. “ইয়ে মুসালমান কা খুন, ইয়ে হিন্দু কা খুন… বাতা ইসমে মুসলমান কা কৌন সা, হিন্দু কা কৌন সা?” – ক্রান্তিবীর (১৯৯৪)

৪. “সও মে সে অসি বেঈমান, ফির ভি মেরা ভারত মহান।” – যশওয়ান্ত (১৯৯৭)

৫. “সালা, এই দুখ কাহে খতম নহি হোতা বে!” – ওয়েলকাম (২০০৭)

৬. “মারাঠা মরতা হ্যায় ইয়া মারতা হ্যায়।” – তিরঙ্গা (১৯৯৩)

৭. “ধন্দে মে কোই কিসি কা ভাই নহি, কোই কিসি কা বেটা নহি।” – পরিন্দা (১৯৮৯)

৮. “হাম সব সিস্টেম কা হিস্সা হেই, সিস্টেম ডিসাইড করতা হ্যায়, অপুন ফলো করতা হ্যায়।” – অব তক ছাপ্পান (২০০৪)

৯. “এক সৈনিক কে লিয়ে উস্কা দেশ হি উস্কা পরিবার হোতা হ্যায়।”

১০. “হাম সব এক হি মিট্টি কে বনে হে।” – ক্রান্তিবীর (১৯৯৪)

ছোট রূপকে বড় আঘাত ও সংযত অভিনয়
১৯৯৭ সালের ‘যশওয়ান্ত’ ছবিতে এক সৎ পুলিশ অফিসারের চরিত্রে সিস্টেমের ভেতরের দুর্নীতির মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি। এই ছবি থেকেই এসেছিল জনপ্রিয় সেই লাইন— “এক মচ্ছর, সালা আদমি কো হিজরা বানা দেতা হ্যায়”। একটি ক্ষুদ্র বিষয় কীভাবে মানুষের ক্ষমতা ধূলিসাৎ করতে পারে, তার নির্মম রূপক ছিল এটি। মেলোড্রামা ছাড়াই একেবারে সাধারণ ও সাবলীল ঢঙে এই ডায়লগ বলে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।

চিৎকার না করে কেবল চোখের ইশারা ও গম্ভীর কণ্ঠস্বরে গম্ভীর আবহ তৈরির জুড়ি মেলা ভার ছিল তাঁর। ‘গুলাম-এ-মুস্তফা’ ছবিতে “মৌত সে বড়্কর কোই দোস্ত নহি হ্যায়…” সংলাপটি তাঁর চরম বাস্তববাদী দর্শনকে ফুটিয়ে তোলে। গ্ল্যামারের ওপর নির্ভর না করে তিনি সবসময় জীবনঘনিষ্ঠ অভিজ্ঞতার আলোকে চরিত্রগুলোকে জীবন্ত করতেন।

সিরিয়াস থেকে কমেডি: সর্বকালের সেরা বহুমুখী প্রতিভা
২০০৪ সালের পুলিশ ড্রামা ‘অব তক ছাপ্পান’-এ এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট সাধু আগাশে চরিত্রে অন্যরকম তীব্রতা নিয়ে হাজির হন তিনি। অপরাধীদের “সমাজ কা কছরা” আর নিজেকে তার “জমাথর” বলে বর্ণনা করার ভঙ্গি প্রমাণ করেছিল পুলিশি পেশাকে কতটা নির্মোহভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারেন তিনি।

অন্যদিকে, ২০০৭ সালের কমেডি ছবি ‘ওয়েলকাম’-এ উদয় শেট্টি চরিত্রে অভিনয় করে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যান নানা। অনিল কাপুরের বিপরীতে এক বদরাগী ডনের খিটখিটে অথচ ডেডপ্যান কমেডি আজও মানুষকে হাসায়। প্রমাণ করে দিয়েছিলেন তীব্র অভিনয় দক্ষতা কমেডির ক্ষেত্রেও সমান সফল।

হিন্দি ও মারাঠি সিনেমা মিলিয়ে ‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘অগ্নিসাক্ষী’, ‘খামোশি’, ‘যশওয়ান্ত’, ‘অব তক ছাপ্পান’ এবং ‘ওয়েলকাম’-এর মতো ক্লাসিক উপহার দিয়েছেন তিনি। যখনই মহান এই অভিনেতার কথা মনে পড়বে, তাঁর সেই অনন্য কণ্ঠস্বরই সবার আগে কানে ভেসে উঠবে—যাঁ একাধারে রাগে ফুটন্ত, আঘাতপ্রাপ্ত, ব্যঙ্গাত্মক ও কৌতুকে ভরপুর হতে পারত।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *