হিমাচলের পাহাড়ে লুকিয়ে ‘মিনি ইজরায়েল’! দেবদারুর জঙ্গলে ইহুদি প্রেম ও ছায়াসঙ্গী বিপদের আসল সত্যিটা কী?

ধৌলাধর পর্বতমালায় ঘেরা, ম্যাকলিওডগঞ্জ থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এক চিলতে সুন্দর পাহাড়ি গ্রাম ‘ধর্মকোট’। কিন্তু ভারতের আর দশটা সাধারণ গ্রামের চেয়ে এটি এক্কেবারে আলাদা। দেবদারুর ঘন জঙ্গল আর তিব্বতি প্রার্থনার পতাকায় ঘেরা এই গ্রামটিকে পুরো বিশ্ব চেনে ‘মিনি ইজরায়েল’ নামে।

ধর্মকোটের বাতাসে পা রাখলেই চমকে যেতে হয়! দোকানের সাইনবোর্ডে জ্বলজ্বল করছে হিব্রু ভাষা, বেকারি থেকে ভেসে আসছে তাজা ‘চল্লা ব্রেড’-এর মৌ মৌ গন্ধ আর সাথে ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে ইজরায়েলি সঙ্গীতের সুর।

গদ্দি সম্প্রদায় থেকে যেভাবে গ্লোবাল ট্যুরিজম হাব
একসময় ধর্মকোট মূলত পশুপালন (গদ্দি সম্প্রদায়) এবং চাষবাসের ওপরেই নির্ভরশীল ছিল। তবে ১৯৬০-এর দশকে যখন পরমপূজনীয় দলাই লামা ধর্মশালায় আসেন, তখন থেকেই এই অঞ্চলে বিদেশি পর্যটকদের আসা শুরু হয়। নিরিবিলি পরিবেশ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং চরম মানসিক শান্তির খোঁজে ইজরায়েলি পর্যটকরা ধীরে ধীরে এই গ্রামটিকে তাঁদের আস্তানা বানিয়ে নেন।

ইজরায়েলি তরুণ-তরুণীরা একটু কোলাহলমুক্ত জায়গা পছন্দ করেন, যা ধর্মকোটের শান্ত উপত্যকা তাঁদের অনায়াসে উপহার দেয়। সময়ের সাথে সাথে এখানকার স্থানীয় দোকানদার ও হোমস্টে পরিচালকরা হিব্রু ভাষায় কথা বলতে ও বুঝতে শিখে গেছেন। আজ রেস্তোরাঁগুলির মেনু কার্ড থেকেও শুরু করে রাস্তার মোড়ের দিক নির্দেশক—সবটাই হিব্রু ভাষায় লেখা থাকে।

‘চাবাদ হাউস’ ও ইজরায়েলি জীবনধারা
ধর্মকোটে প্রবেশ করলে মনেই হবে না আপনি ভারতে আছেন! গ্রামের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত তিন তলার লাল রঙের ‘চাবাদ হাউস’ ভবনটি ইজরায়েলি সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় ও সামাজিক কেন্দ্র। এখানে তাঁরা নিজেদের প্রার্থনা, বার্ষিক উৎসব ও আড্ডার জন্য জড়ো হন।

এখানকার প্রতিটা ক্যাফেতে পরিবেশন করা হয় ইজরায়েলের ঐতিহ্যবাহী ফলাফেল (Falafel), পিটা ব্রেড (Pita Bread), শাকশুকা (Shakshuka)-র মতো জিভে জল আনা খাবার। এছাড়া যোগব্যায়াম, মেডিটেশন (তুশিতা মেডিটেশন সেন্টার), জুয়েলারি ডিজাইনিং এবং সঙ্গীত শেখার জন্য ইজরায়েলি তরুণ-তরুণীরা মাসের পর মাস এখানে পড়ে থাকেন।

প্রেম ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন: মায়া ও গোপালের গল্প
ধর্মকোট কেবল পর্যটনকেন্দ্র নয়, মানবিক সম্পর্ক ও দুটি ভিন্ন সংস্কৃতির সুন্দর মিলনের এক বড় নিদর্শন। ২০০৮ সালে ১৮ বছর বয়সে প্রথমবার ইজরায়েল থেকে ভারতে আসেন মায়া (৩৯)। ধর্মকোট ভ্রমণের সময় তাঁর পরিচয় হয় চেন্নাইয়ের বাসিন্দা গোপাল সুব্রহ্মণ্যম (৫০)-এর সাথে। সময়ের সাথে সেই পরিচয় গড়ায় ভালোবাসায় এবং পরবর্তীতে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

আজ এই দম্পতি ভাগসু নাগে একটি গেস্ট হাউস ও রেস্তোরাঁ চালাচ্ছেন। তাঁদের দুটি সন্তানও রয়েছে—মেয়ে সংসার ও ছেলে অগম। ইজরায়েলের নাগরিকত্ব থাকলেও মায়া গর্বের সাথে বলেন, “আমার শরীর ইজরায়েলের হতে পারে, কিন্তু আমার মন ও আত্মা এখন পুরোপুরি ভারতীয়!”

হঠাৎ পুলিশি প্রহরা ও নিরাপত্তা বাড়ানোর কারণ
সাম্প্রতিক সময়ে কঙ্গরা জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন ধর্মকোট এবং এর আশেপাশের স্পর্শকাতর এলাকায় টহলদারি বাড়িয়ে দিয়েছে। কঙ্গরার পুলিশ সুপার (SP) কুলভূষণ ভার্মা জানান, “ইজরায়েলি নাগরিকরা আলাদা করে কোনো নিরাপত্তা চাননি, তবে আগাম সতর্কতা হিসেবে আমাদের টিম দিনে অন্তত দু’বার পুরো গ্রাম টহল দেয়। প্রতিটি বিদেশি ও ইজরায়েলি নাগরিকের সমস্ত তথ্য পুলিশের খাতায় নথিবদ্ধ রয়েছে। কয়েকদিন আগে কিছু অসামাজিক উপাদান দেওয়ালে আপত্তিকর ছবি ও লেখা আঁকার চেষ্টা করেছিল, তবে দ্রুত এফআইআর (FIR) করে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।”

ইজরায়েলিদের ভিড় কমার মূল ৩টি কারণ
চলতি মরশুমে ধর্মকোটে ইজরায়েলি পর্যটকদের সংখ্যা আগের চেয়ে কিছুটা কমেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা এর পেছনে ৩টি মূল কারণ চিহ্নিত করেছেন:
১. মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থা: ইজরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে টানা সংঘাত চলায় এবং সরাসরি বিমান পরিষেবা বন্ধ থাকায় যাত্রা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল হয়ে পড়েছে।
২. বাধ্যতামূলক সেনাসেবা: ইজরায়েলে ১৮ বছর হলেই তরুণ-তরুণীদের সেনাসেবায় যোগ দেওয়া বাধ্যতামূলক, যার কারণে অনেক ইজরায়েলি তরুণ ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আসতে পারছেন না।
৩. রিলস মেকারদের কোলাহল: সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য দিনরাত রিল বানানো ঘরোয়া পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ায়, একান্তপ্রিয় বিদেশি পর্যটকরা এখন আরও ভেতরের নিস্তব্ধ জায়গার দিকে ঝুঁকছেন।

Saheli Saha
  • Saheli Saha

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *