হঠাৎ দিল্লি তলব! প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একের পর এক গোপন বৈঠক ভারতীয় হাইকমিশনারের, বড় চাল দিল্লির?

ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী আচমকাই দিল্লি গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে এক একান্ত বৈঠকে মিলিত হয়েছেন। গত জুন মাসে বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনারের দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই তাঁর দ্বিতীয় দিল্লি সফর। এত অল্প সময়ের ব্যবধানে একজন শীর্ষ রাষ্ট্রদূতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি ও গোপনীয়তায় মোড়া বৈঠক অত্যন্ত নজিরবিহীন এবং তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশের বিদেশ প্রতিমন্ত্রীর ভূয়সী প্রশংসা ও নতুন জল্পনা
সোমবার সন্ধ্যার বিমানে দীনেশ ত্রিবেদী ঢাকা ছাড়ার ঠিক আগে ও পরে বাংলাদেশের বিদেশ প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের কিছু মন্তব্য দুই দেশের কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক গুঞ্জন তৈরি করেছে। ভারতীয় হাইকমিশনারের খোলাখুলি প্রশংসা করে হুমায়ুন কবির বলেন, “দীনেশ ত্রিবেদী দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। আমরা আশা করি ভারত সরকার তাদের হাইকমিশনারের পরামর্শ ও বক্তব্যকে পূর্ণ মর্যাদা দেবে।”
তবে এই প্রশংসার আড়ালেই বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে সুর চড়িয়েছেন হুমায়ুন কবির। তিনি স্পষ্ট জানান, শেখ হাসিনার জন্যই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে পারছে না।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ও তারেক রহমানের ভারত সফর
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে প্রশ্ন করা হলে বিদেশ প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির কটাক্ষের সুরে জানান, তারেক রহমান কখনোই ভারতে যাবেন না বলেননি। তবে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়টিকে সরাসরি শর্ত হিসেবে সামনে এনেছেন তিনি।
কবির বলেন, “একজন সন্ত্রাসী যেভাবে দিল্লিতে বসে হুমকি দিচ্ছে, এমন পরিস্থিতি যদি বাংলাদেশে বসে কেউ ভারতের বিরুদ্ধে করতো, তবে কি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বাংলাদেশে সফর করতেন?” তাঁর এই কঠোর বক্তব্য থেকে কূটনীতিবিদদের একাংশের ধারণা—শেখ হাসিনাকে ফেরত না পাওয়া পর্যন্ত তারেক রহমানের বহু কাঙ্ক্ষিত দিল্লি সফর বাস্তবায়িত হওয়া কঠিন। উল্লেখ্য, গত আগস্টেও প্রায় একই দাবি তুলে শেষ মুহূর্তে ভারত সফর বাতিল করেছিলেন তারেক রহমান।
ঢাকায় কড়া বার্তা, তাও কেন বিগলিত বাংলাদেশ?
ঢাকা ত্যাগ করার আগে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দীনেশ ত্রিবেদী স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে, শেখ হাসিনাকে ভারতের সেনাবাহিনী ঢাকা থেকে নিয়ে আসেনি, বরং বাংলাদেশের বিমান বাহিনীর বিমানই তাঁকে ভারতে পৌঁছে দিয়েছিল। ভারত কেবল বন্ধুত্বের খাতিরে সেই বিমানকে অবতরণের অনুমতি দিয়েছিল, কারণ তখনও শেখ হাসিনা আইনিভাবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
ভারতীয় হাইকমিশনারের এই স্পষ্ট ও চাঁচাছোলা জবাবের পরেও কেন বাংলাদেশের বিদেশ প্রতিমন্ত্রী এতটা নমনীয় ও প্রশংসায় পঞ্চমুখ—তা নিয়ে উঠতে শুরু করেছে নানা প্রশ্ন। তবে কি শেখ হাসিনাকে ফেরানো বা দিল্লি সফর নিয়ে ভারত কোনো বিশেষ সুসংবাদ বা নমনীয় প্রস্তাব দিয়েছে?
সেনাপ্রধান ও বিদেশ সচিবের সঙ্গেও হাই-প্রোফাইল বৈঠক
দিল্লি সফরে কেবল প্রধানমন্ত্রী মোদীই নন, দীনেশ ত্রিবেদী বৈঠক করেছেন ভারতের নতুন সেনাপ্রধান জেনারেল ধীরাজ শেঠের সঙ্গেও। এই বৈঠকে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে নিরাপত্তা, ত্রিপাক্ষিক সহযোগিতা ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। পাশাপাশি ভারতের বিদেশ সচিব বিক্রম মিস্রির সঙ্গেও বর্তমান বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন হাইকমিশনার।
সব মিলিয়ে, ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনারের এই আকস্মিক সফর এবং দিল্লিতে পরপর শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না, সেদিকেই নজর রাখছে অভিজ্ঞ মহল।