ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আইপিও নিয়ে আসছে জিও! মুকেশ আম্বানির মেগা প্ল্যানে পকেট ভরবে বিনিয়োগকারীদের?

ভারতীয় শেয়ার বাজারের ইতিহাসে এখনও পর্যন্ত সবথেকে বড় পাবলিক ইস্যু বা আইপিও (IPO) আনার প্রস্তুতি প্রায় সম্পূর্ণ করে ফেলেছে রিল্যায়ান্স। মুকেশ আম্বানির নেতৃত্বাধীন সংস্থা ‘জিও প্ল্যাটফর্মস’ (Jio Platforms) এবার তাদের বহুপ্রতীক্ষিত আইপিও নিয়ে বাজারে নামতে চলেছে। এই মেগা ইস্যুর মাধ্যমে কোম্পানি প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৩৭,৭০০ কোটি টাকা তহবিল সংগ্রহের বিরাট পরিকল্পনা নিয়েছে। উৎসবের মরশুম তথা দুর্গাপুজোর ঠিক পরেই প্রাইমারি মার্কেটে এই বিশাল আলোড়ন দেখতে পাওয়া যাবে। বিশ্বস্ত সূত্রে খবর, আগামী ১২ অক্টোবরের পরেই কোম্পানি তাদের রেড হেরিংস প্রস্পেক্টাস (RHP) জমা দিতে পারে। এই আইপিও-র জন্য ১,১৫০ টাকা থেকে ১,২২০ টাকা প্রতি শেয়ারের প্রাইস ব্যান্ড নির্ধারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কবে থেকে শুরু হবে বিনিয়োগের সুযোগ?
এই পাবলিক ইস্যুর সম্পূর্ণ টাইমলাইন ইতিমধ্যেই চূড়ান্ত করা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এঙ্কর বিনিয়োগকারীদের জন্য নিলাম বা বিডিংয়ের প্রক্রিয়া ১৯ অক্টোবর খোলা হতে পারে। এর ঠিক পরেই ২১ অক্টোবর থেকে সাধারণ ও খুচরো বিনিয়োগকারীদের জন্য এই ইস্যু সাবস্ক্রিপশনের উদ্দেশ্যে উন্মুক্ত হবে। রিটেল বিনিয়োগকারীরা ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত এই আইপিও-তে নিজেদের টাকা বিনিয়োগ করার সুযোগ পাবেন।
শেয়ার কেনাবেচার প্রাথমিক প্রক্রিয়া মিটে যাওয়ার পর আগামী ২৬ অক্টোবর শেয়ার অ্যালটমেন্ট বা বরাদ্দের দিন নির্ধারিত হয়েছে। যদি সমস্ত পরিকল্পনা নিখুঁতভাবে এগোয়, তবে আগামী ২৮ অক্টোবরের মধ্যেই কোম্পানির শেয়ারগুলি দেশের অভ্যন্তরীণ স্টক এক্সচেঞ্জে লিস্টেড হয়ে যাবে। সংস্থার লক্ষ্য রয়েছে ৩০ অক্টোবরের আগেই আইপিও সংক্রান্ত সমস্ত আইনি ও দাপ্তরিক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করে ফেলা। উল্লেখ্য, চলতি বছরের জুনেই জিও প্ল্যাটফর্মস তাদের ড্রাফট পেপার জমা দিয়েছিল, যা গত ২৮ আগস্ট বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেবি (SEBI)-র পক্ষ থেকেও সবুজ সঙ্কেত পেয়ে গিয়েছে।
হুডাইকে পেছনে ফেলে দেশের সর্বকালের বৃহত্তম আইপিও
জিও প্ল্যাটফর্মসের এই আইপিও ভারতের শেয়ার বাজারের সমস্ত পুরনো রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস গড়তে চলেছে। এটি ২০২৪ সালে আসা হুন্ডাই মোটর ইন্ডিয়া লিমিটেডের ২৭,৮৫৯ কোটি টাকার আইপিও-কে পিছনে ফেলে দেবে, যা এতদিন দেশের সবচেয়ে বড় সফল আইপিও হিসেবে বিবেচিত হতো। এছাড়াও ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ (NSE) সাম্প্রতিক সময়ে ২২,৫৬২ কোটি টাকার ইস্যু এনেছিল। জিও-র এই প্রস্তাবিত পাবলিক ইস্যু সেই সমস্ত রেকর্ডকে পিছনে ফেলে অনেকদূর এগিয়ে যাবে।
ড্রাফট রেড হেরিংস প্রস্পেক্টাস (DRHP) অনুযায়ী, জিও প্ল্যাটফর্মস এই আইপিও-র মাধ্যমে প্রায় ২৭ কোটি বা ২৭০ মিলিয়ন নতুন ইকুইটি শেয়ার বাজারে ছাড়ার প্রস্তাব নিয়ে আসছে। এই নতুন শেয়ারগুলি কোম্পানির পোস্ট-ইশযুগীন ইকুইটি ক্যাপিটালের প্রায় ২.৯ শতাংশ অংশ হবে। এই ইস্যুর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এতে পুরোটাই ‘ফ্রেশ ইস্যু’ বা নতুন শেয়ার রাখা হয়েছে। এখানে কোনো অফার ফর সেল (OFS)-এর অংশ রাখা হয়নি, যার স্পষ্ট অর্থ হলো কোম্পানির বর্তমান কোনো বিনিয়োগকারী নিজেদের হাতে থাকা পুরনো শেয়ার বিক্রি করছেন না। প্রসঙ্গত, রিল্যায়ান্স ইন্ডাস্ট্রিজ গ্রুপের কাছেও এই ঘটনা অত্যন্ত ঐতিহাসিক, কারণ দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর পর এই গ্রুপ সরাসরি পাবলিক মার্কেটে প্রবেশ করছে। এর আগে ২০০৬ সালে রিল্যায়ান্স গ্রুপ ‘রিল্যায়ান্স পেট্রোলিয়াম’-এর লাইস্টিং করিয়েছিল।
বিপুল অর্থ ব্যয়ের প্রধান উদ্দেশ্য ঋণ শোধ
আইপিও থেকে সংগৃহীত এই বিপুল পরিমাণ মূলধন কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তার একটি পরিষ্কার রোডম্যাপ তৈরি করেছে কোম্পানি। সংগৃহীত পুঁজির একটি বিরাট অংশ খরচ করা হবে রিল্যায়ান্স জিও ইনফোকম লিমিটেড (RJIL)-এর পুরোনো ঋণ বা লোন পরিশোধের কাজে। উল্লেখ্য, আরজিআইএল হলো জিও প্ল্যাটফর্মসের মূল অপারেটিং সাবসিডিয়ারি কোম্পানি। পরিকল্পনামাফিক প্রায় ২৭,৫০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের প্রি-পেমেন্ট বা অগ্রিম মেটানো হবে। এর ফলে কোম্পানির ব্যালেন্স শিটের উপর থেকে বিশাল আর্থিক বোঝা অনেকটাই হালকা হবে। ঋণ পরিশোধের পর যে উদ্বৃত্ত তহবিল হাতে থাকবে, তা কোম্পানির দৈনন্দিন সাধারণ করপোরেট কাজে (General Corporate Purposes) ব্যবহার করা হবে।
ডিআরএইচপি-র তথ্য অনুযায়ী, অপারেটিং কোম্পানি আরজিআইএল-কে বিভিন্ন উপায়ে এই ফান্ড ট্রান্সফার করতে পারে জিও প্ল্যাটফর্মস। এর মধ্যে ইকুইটি শেয়ার কেনা, রূপান্তরযোগ্য বা অ-রূপান্তরযোগ্য প্রেফারেন্স শেয়ার বা ডিবেঞ্চার জারি করার মতো পথ খোলা রয়েছে। এছাড়াও সরাসরি লোন দিয়ে বা এই সমস্ত বিকল্পগুলিকে একসঙ্গে মিলিয়েও অর্থ স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিতে পারে সংস্থা।
বিশ্বের বাঘা বাঘা বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের অংশীদারিত্ব
জিও প্ল্যাটফর্মসের অন্দরে দেশ ও বিদেশের বহু নামী এবং শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বড় অংশীদারিত্ব রয়েছে। বর্তমানে এই বড় বড় গ্লোবাল ইনস্টিটিউশনাল ইনভেস্টররা মিলে কোম্পানির প্রায় ৩০.৯ শতাংশ অংশ নিয়ন্ত্রণ করছেন। এর মধ্যে বিশ্বের সেরা টেক জায়ান্টরা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ফেসবুকের মূল কোম্পানি মেটা প্ল্যাটফর্মসের সহযোগী সংস্থা ‘জাদু হোল্ডিংস’ (Jaadhu Holdings)-এর হাতে রয়েছে ৯.৯৮ শতাংশ অংশীদারিত্ব। অন্যদিকে, গুগল ইন্টারন্যাশনালের হাতে রয়েছে ৭.৭৩ শতাংশ হিস্যা।
এই দুই টেক জায়ান্ট ছাড়াও সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড (PIF), সিলভার লেক, ভিস্তা ইক্যুইটি, জেনারেল আটলান্টিক, কেকেআর-এর বিভিন্ন সহযোগী সংস্থাসহ আবুধাবি ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি (ADIA) দ্বারা পরিচালিত একাধিক বড় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ তহবিল জিও-র দীর্ঘদিনের অংশীদার হিসেবে যুক্ত রয়েছে।