কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ার ড্রোন হামলা! তুরস্কের কার্গো জাহাজে আগুন, তিন ভারতীয় নাবিকের ভাগ্যে কী ঘটল?

কৃষ্ণসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজের উপর একের পর এক ড্রোন হামলাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সমুদ্রপথে নতুন করে উদ্বেগ তীব্র হয়েছে। রাশিয়ার ভয়ংকর ড্রোন হামলায় তুরস্কের মালিকানাধীন একটি কার্গো জাহাজে হঠাৎই আগুন ধরে যায়। ওই জাহাজটিতে মোট তিনজন ভারতীয় নাগরিক কর্মরত ছিলেন, যাঁদের মধ্যে একজন গুরুতর আহত হয়েছেন। বর্তমানে রোমানিয়ার একটি হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা চলছে। তবে ভারতীয় দূতাবাস সূত্রে জানানো হয়েছে, তিন ভারতীয় নাগরিকই সুরক্ষিত রয়েছেন এবং তাঁদের সমস্ত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও কূটনৈতিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
ঠিক কী ঘটেছিল কৃষ্ণসাগরে?
জানা গিয়েছে, ঘটনাটি ঘটেছে কৃষ্ণসাগরে রোমানিয়ার জলসীমার ঠিক বাইরে। আক্রান্ত ওই শস্যবাহী জাহাজটির নাম ‘এমভি রয়াদ মাম্মাদভ’ (MV Royad Mammadov), যা ইতালি যাওয়ার পথে ওই জলপথ দিয়ে এগোচ্ছিল। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির দাবি অনুযায়ী, রাশিয়ার দুটি ড্রোন ওই বেসামরিক জাহাজে সরাসরি হামলা চালায়। যার জেরে জাহাজটিতে মুহূর্তের মধ্যে আগুন ধরে যায়। এই মর্মান্তিক ঘটনায় অন্তত দু’জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে, যদিও নিহতদের সঠিক জাতীয়তা এখনও পর্যন্ত পুরোপুরি স্পষ্ট করা হয়নি। জেলেনস্কির দাবি, হামলায় জাহাজের ক্যাপ্টেন প্রাণ হারিয়েছেন এবং মোট ১১ জন ক্রু সদস্যকে পরবর্তীতে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়। তবে এই নির্দিষ্ট হামলার বিষয়ে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
ভারতের প্রতিক্রিয়া ও দূতাবাসের তৎপরতা
হামলার খবর প্রকাশ্যে আসতেই ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়ে নয়াদিল্লিতে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়। রোমানিয়ায় অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস দ্রুত তৎপর হয়ে জানায়, ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজটিতে তিনজন ভারতীয় নাগরিক ছিলেন। ঘটনার পর রোমানিয়ায় নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত মনোজ মহাপাত্র সরাসরি ওই তিন ভারতীয়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন এবং তাঁদের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেন। পাশাপাশি, কনস্টান্টা কাউন্টি হাসপাতালের চিকিৎসকদের সঙ্গেও কথা বলেন রাষ্ট্রদূত। দূতাবাসের তরফে আশ্বস্ত করে জানানো হয়েছে, সমস্ত ভারতীয় নাগরিক ভালো আছেন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন।
এই ঘটনার পর অত্যন্ত কড়া ভাষায় নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে নয়াদিল্লি। দেশের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, কৃষ্ণসাগর থেকে শুরু করে উপসাগরীয় অঞ্চল—যেখানেই বেসামরিক জাহাজে হামলা হোক না কেন, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের সমাধানে আলোচনার পথকেই ভারত বরাবর সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম বলে মনে করে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
কেন সংবেদনশীল এই কৃষ্ণসাগর অঞ্চল?
ইউরোপ ও সমগ্র বিশ্বের মধ্যে খাদ্যশস্য, জ্বালানি-সহ বিভিন্ন অত্যন্ত জরুরি পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রে কৃষ্ণসাগর অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবে এই অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ক্রমশ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। লাগাতার ড্রোন হামলা, ক্ষেপণাস্ত্রের আতঙ্ক এবং সমুদ্রপথের অন্যান্য নিরাপত্তা ঝুঁকির জেরে আন্তর্জাতিক শিপিং সংস্থাগুলির দুশ্চিন্তা বহুলাংশে বেড়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের বেসামরিক জাহাজে বারবার হামলা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিশ্বজুড়ে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। কৃষ্ণসাগরে ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়ে ফের একবার যে বড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হলো, এই সংকটময় পরিস্থিতিতে সেটাই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।