৩৪ হাজার ফুট উঁচুতে ককপিটে চরম আতঙ্ক! সহ-পাইলটের হামলায় সেকেন্ডে ১৬ হাজার ফুট নিচে নেমে গেল যাত্রীবাহী বিমান

আকাশপথে নিরাপত্তার চরম নজিরবিহীন এক রোমহর্ষক ঘটনার সাক্ষী থাকল বিশ্ব। গত ৩০শে সেপ্টেম্বর দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের (Flydubai) ফ্লাইট FZ1073-এর ককপিটে ঘটা এক হিংসাত্মক হামলায় বিশ্বজুড়ে রীতিমতো আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। ১৭৪ জন যাত্রী নিয়ে ৩৪,০০০ ফুট উঁচুতে ওড়ার সময় ওমানি সহ-পাইলট হামাম আল-হামামি ভারতীয় বংশোদ্ভূত ক্যাপ্টেন স্মিত মাচারকে হঠাৎ আক্রমণ করে বসেন। এই আকস্মিক ধস্তাধস্তির জেরে মুহূর্তের মধ্যে বিমানটি প্রায় ১৬,০০০ ফুটে নেমে আসে, যা যাত্রীদের মধ্যে ত্রাস সৃষ্টি করে।
জরুরি কোড ও নাটকীয় অবতরণ
ঘটনা চলাকালীন ককপিট থেকে প্রথমে সাধারণ জরুরি কোড ‘৭৭০০’ এবং পরবর্তীতে বিমান হাইজ্যাক বা অবৈধ হস্তক্ষেপের ইঙ্গিতবাহী কোড ‘৭৫০০’ পাঠানো হয়। এদিকে মারাত্মকভাবে আহত হওয়া সত্ত্বেও ক্যাপ্টেন স্মিত মাচার ককপিটের দরজা খুলতে সাহায্য করেন। এরপর সাহসী যাত্রী ও ক্রুরা দ্রুত ভেতরে প্রবেশ করে ওই আক্রমণকারী সহ-পাইলটকে কোনোমতে কাবু করেন। পরবর্তীতে বিমানটিকে সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করানো হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষ যাত্রী ও ক্রুদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করে এবং পরবর্তী সময়ে উভয় পাইলটকে আবুধাবিতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
কে এই সহ-পাইলট হামাম? নিরাপত্তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন
হামাম আল-হামামির পরিচয় প্রকাশ্যে আসার পরেই বিশ্বজুড়ে সুরক্ষার ফাঁকফোকর নিয়ে বিরাট প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি একজন ওমানি নাগরিক এবং ২০২৪ সালে তাঁর চরমপন্থী মতাদর্শের কথা প্রকাশ্যে আসায় ‘ওমান এয়ার’-এ তাঁর ফ্লাইট প্রশিক্ষণ স্থগিত করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও কীভাবে তিনি ফ্লাইদুবাইয়ের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থায় সহ-পাইলটের চাকরি পেলেন, তা নিয়ে এখন উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু হয়েছে।
৯টি দেশের সংযোগ ও বহুমুখী তদন্ত
এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটির সঙ্গে একাধিক দেশের যোগসূত্র উঠে আসায় বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে জোরদার তদন্ত:
সংযুক্ত আরব আমিরাত: দুবাই থেকে বিমানটি ওড়ায় ইউএই একটি বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করেছে। এর নেপথ্যে কোনো সুনির্দিষ্ট পূর্বপরিকল্পনা বা সন্ত্রাসী যোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ভারত: আক্রান্ত ক্যাপ্টেন স্মিত মাচার একজন ভারতীয়। জীবন বাজি রেখে শেষ পর্যন্ত তিনি যেভাবে বিমান ও যাত্রীদের রক্ষা করেছেন, তার ভূয়সী প্রশংসা করা হচ্ছে।
ইসরায়েল: বিমানটির গন্তব্য ছিল তেল আবিব এবং যাত্রীদের বড় অংশই ছিলেন ইসরায়েলি। ইসরায়েলি গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মতে, এটি আদতে ‘৯/১১’-এর ধাঁচে একটি বড়সড় বিমান হামলার প্রস্তুতি হতে পারত।
সিরিয়া ও ওমান: হামাম সংযুক্ত আরব আমিরাতে ওমানি বাবা ও সিরীয় মায়ের ঘরে জন্ম নেন। সিরিয়ায় কাটানো দীর্ঘ সময়ে তিনি চরমপন্থী আদর্শে প্রভাবিত হয়েছিলেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
ফিলিস্তিন ও আমেরিকা: হামামের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্টে ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ সম্পর্কিত প্রচারপত্র ও সাহিত্য মিলেছে। এই ঘটনায় ইরানের যোগসূত্র থাকার জল্পনা উঠলেও এখনও পর্যন্ত কোনো জোরালো প্রমাণ মেলেনি। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, এতে অন্য কোনো রাষ্ট্রের হাত প্রমাণিত হলে যুক্তরাষ্ট্র তার যথাযথ ও কড়া জবাব দেবে।
ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো ধরনের গুজবে কান না দেওয়ার জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রশাসন সাধারণ মানুষের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিমান নিরাপত্তার ইতিহাসে এই ঘটনা এক অন্ধকার অধ্যায় হয়ে রইল।