ছেলের হাতে বারণ যে গেম নিয়ে, আজ সেটাই তাঁর নেশা! ৬০ বছর বয়সে এই চিনা মায়ের কাণ্ড দেখলে চোখ কপালে উঠবে

যে মা একদিন নিজের ছেলের ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভিডিও গেম খেলা একবিন্দুও সহ্য করতে পারতেন না, আজ তিনিই কম্পিউটারের সামনে বসে রাত কাটিয়ে দেন। শুধু তাই নয়, তাঁর লাইভস্ট্রিমিং দেখতে অনলাইনে ভিড় জমান হাজার হাজার মানুষ! শুনতে অবাক লাগলেও বাস্তব জীবনের এই রূপকথার মতো গল্পটি চীনের ৬০ বছর বয়সি ঝং জুয়ানজুয়ানের (Zhong Xuanjuan)। ইন্টারনেটে যিনি সবার কাছে অত্যন্ত আদরের ‘আন্টি জুয়ান’ (Aunt Juan) নামে পরিচিত। আজ তাঁর ফলোয়ারের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৫ লক্ষ ২৭ হাজার, আর প্রতিটি লাইভ সেশন মায়াবী টানে উপভোগ করেন প্রায় ১০ হাজার মানুষ।
যেখান থেকে শুরু হয়েছিল গল্পের
চীনের গুয়াংডং প্রদেশের মেইঝৌ শহরের উপকণ্ঠে বসবাসকারী ঝংয়ের জীবনটা আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতো ছিল না। অত্যন্ত সাধারণ পরিবারে বড় হওয়া ঝং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে শৈশব থেকেই জীবন সংগ্রামে নেমেছিলেন। বিক্রয়কর্মী থেকে শুরু করে শিশু পরিচর্যার মতো ছোটখাটো কাজ করে জীবনের পথ চলেছেন। প্রায় ১০ বছর আগে তিনি কাজ থেকে অবসর নেন। তবে তাঁর জীবনের আসল ও আকস্মিক মোড়টি আসে ২০২০ সালে।
সেই সময় অনলাইনে ‘সুওদে’ নামে পরিচিত তাঁর ছোট ছেলে চাকরি ছেড়ে বাড়িতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কম্পিউটারে গেম খেলতে শুরু করে। আর এখানেই ফিরে আসে অতীতের স্মৃতি। ঠিক দুই দশক আগে, যখন এই ছেলেই স্কুলে পড়ত এবং সারাদিন গেমে মগ্ন থাকায় পড়াশোনা ক্ষতিগ্রস্ত হতো, তখন ঝং রেগে গিয়ে ইন্টারনেট ক্যাফে থেকে তাঁকে চড়থাপ্পড় মেরে বাড়ি ফিরিয়ে আনতেন। কিন্তু ভাগ্যের কী পরিহাস! যে খেলা একদিন ছেলের পড়শোনার বারোটা বাজিয়েছিল, একদিন কৌতূহলের বশে সেই খেলায় নিজেই হাত দিলেন মা।
শুরু হলো এক অবিশ্বাস্য লড়াই
ছেলের কাছ থেকেই গেমের প্রাথমিক পাঠ নেওয়া শুরু করেন ষাটোর্ধ্ব ঝং। তবে পথটা মোটেই ফুল দিয়ে সাজানো ছিল না। বয়সের ভারে চোখের দৃষ্টি কিছুটা ঝাপসা, রিফ্লেক্স বা মানসিক প্রতিক্রিয়াও তরুণদের মতো চটজলদি কাজ করত না। ফলে খেলায় বারবার দেওয়ালে ধাক্কা খাওয়া, উল্টো দিকে ঘুরে যাওয়া বা ভার্চুয়াল সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গিয়ে হোঁচট খাওয়া ছিল তাঁর নিত্যদিনের ঘটনা। কিন্তু নাছোড়বান্দা ঝং হাল ছাড়েননি।
অবিরাম অনুশীলন আর জেদের জোরে তিনি শুটিং গেমে দারুণ পারদর্শী হয়ে ওঠেন। শুধু তাই নয়, তরুণ প্রজন্মের গেমারদের ব্যবহৃত কঠিন সব গেমিং পরিভাষাও তাঁর মুখে সাবলীল হয়ে ওঠে। ২০২২ সালে তিনি যখন প্রথম লাইভস্ট্রিমিং শুরু করেন, তখন একজন ৬০ বছর বয়সি সাধারণ চিনা নারীকে অস্ত্র হাতে ভার্চুয়াল দুনিয়ায় ঝড় তুলতে দেখে চোখ কপালে ওঠে নেটিজেনদের। ধীরে ধীরে ইন্টারনেটের সেনসেশন হয়ে ওঠেন তিনি।
বিশ্বতারকাকে মাত ও সমালোচকদের কড়া জবাব
ইতিমধ্যেই গেম খেলার ৮ হাজার ঘণ্টার গণ্ডি পার করে ফেলেছেন ঝং। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ‘কাউন্টার-স্ট্রাইক: গ্লোবাল অফেনসিভ’-এর একটি অনলাইন প্রদর্শনী ম্যাচে খেলার সুযোগ পান তিনি। সেই ম্যাচে ১৭ বছর বয়সি রাশিয়ান গেমিং prodigy ‘ডঙ্ক’-এর মুখোমুখি হয়ে তাঁকে নক-আউট করে পুরো বিশ্বকে চমকে দেন এই চিনা প্রৌঢ়া!
অবশ্য এই আকাশচুম্বী সাফল্যের পাশাপাশি অনেক নেটিজেন সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন যে, পর্দার আড়াল থেকে অন্য কেউ হয়তো তাঁর হয়ে খেলছে। এই অপবাদ দূর করতে তাঁর ছেলে ঘরে একাধিক ক্যামেরা সেট আপ করে দেন, যাতে সারা বিশ্বের মানুষ লাইভ দেখতে পায় যে ঝং নিজেই খেলছেন। সমাজ যে বয়স্ক মহিলাদের কেবল রান্নাঘর ও গৃহস্থালির চার দেওয়ালের মধ্যে দেখতে অভ্যস্ত, তাঁদের উদ্দেশে ঝং সগর্বে বলেছেন, “মা হওয়ার অর্থ এই নয় যে আমার জীবন কেবল ঘরের কাজেই আটকে থাকবে।”
আজ তাঁর কাছে গেমিং কেবল বিনোদন নয়, বরং মস্তিষ্ক সচল রাখার এবং নতুন কিছু শেখার দুর্দান্ত এক মাধ্যম। আর যে ছেলেকে একসময় গেম খেলার অপরাধে বকাঝকা করতেন, আজ সেই ছেলেই তাঁর মায়ের ফুল-টাইম এজেন্ট ও গেমিং ক্যারিয়ারের চালিকাশক্তি! এমনকি মাঝরাতে মায়ের গেমিংয়ের নেশা কাটাতে ঘরের ইন্টারনেট পর্যন্ত বন্ধ করে দেন ছেলে। বয়সকে নিছক সংখ্যার বেড়াজাল প্রমাণ করে আজ বাস্তব জীবনের পিচে এক অন্য লড়াকু সুপারস্টার ‘আন্টি জুয়ান’।