১৬ বছর ধরে অঙ্ক ক্লাস বন্ধ! ‘মাস্টারমশাই নেই, তাই অষ্টম শ্রেণির পরে আর পড়ব না’, রাজ্যের মন্ত্রী’র গ্রামের বিস্ফোরক ছবি

রাজ্যের মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডুর গ্রাম। বাঁকুড়ার বারিকুল থানার ভূলাগাড়া জুনিয়ার হাইস্কুল। আর সেখানেই গত ১৬ বছর ধরে নেই কোনো অঙ্কের শিক্ষক! এই দীর্ঘ সময়ে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত এক দিনের জন্যও হয়নি কোনো অঙ্কের ক্লাস। ফলে অঙ্ক ভয়ে প্রতি বছর অষ্টম শ্রেণির পরেই স্কুলছুট হচ্ছেন বহু ছাত্র-ছাত্রী।
খোদ মন্ত্রীর এলাকার এই স্কুলে শিক্ষকের অভাবে চলছে এক চরম বেহাল অবস্থা। ইতিহাসের শিক্ষিকা কোনওক্রমে সামাল দিচ্ছেন ভূগোলের ক্লাস। ইংরাজির শিক্ষিকাকে নিতে হচ্ছে বিজ্ঞানের ক্লাস। বাংলার শিক্ষিকাকে বাংলা ছাড়াও কখনও পড়াতে হচ্ছে বিজ্ঞান, আবার কখনও ভূগোল। এমনকি অঙ্কের ক্লাস? স্কুলের গ্রুপ ডি কর্মী ফাঁকা সময় পেলে পঞ্চম শ্রেণির পড়ুয়াদের মাঝেমধ্যে অংক শিখিয়ে দেন, কিন্তু গত ১৬ বছরে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণীর পড়ুয়াদের অঙ্কের ক্লাস হয়নি একদিনও।
বাম আমলের শেষের দিকে মাওবাদীদের মুক্তাঞ্চল হয়ে থাকা বাঁকুড়ার এই প্রত্যন্ত এলাকায় পরিকাঠামো গত দশক থেকে কিছুটা ফিরলেও, কপাল ফেরেনি ভূলাগাড়া জুনিয়ার হাইস্কুলের। এই স্কুলের পড়ুয়ারা মামনি, সঙ্গীতা, শুভদ্রা, জনতা, মন্দিরাদের কেউ চিকিৎসক হতে চায়, কেউ বা স্কুল শিক্ষিকা। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের অন্যতম বড় বাধা এই স্কুলের পরিকাঠামো। স্কুলে মাত্র ৩ জন শিক্ষিকা কোনওক্রমে সামাল দিচ্ছেন ৪টি শ্রেণির পঠন পাঠন।
স্কুলের পড়ুয়াদের একটা বড় অংশ পরিবারের প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়া। বাড়িতে অঙ্ক শেখানোর মতো কেউ নেই। আর্থিকভাবে অত্যন্ত দূর্বল পরিবারগুলির পক্ষে টিউশানি দেওয়াও কার্যত অসম্ভব। গ্রামের কাছাকাছি নেই অন্য কোনো হাই বা জুনিয়ার হাইস্কুল। গ্রাম থেকে ৭-১২ কিমি পাহাড় জঙ্গলপথ পেরিয়ে অন্য হাইস্কুলে ছোট ছোট পড়ুয়াদের পাঠানোর ক্ষেত্রেও রয়েছে নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্যা। অগত্যা অঙ্ক না শিখেই একের পর এক ক্লাসের বেড়া ডিঙিয়ে অষ্টম শ্রেণি পাস করে যাচ্ছে ভূলাগাড়া জুনিয়ার হাই স্কুলের পড়ুয়ারা। তারপর একদিকে প্রবল অঙ্ক ভীতি আর অন্যদিকে নিকটবর্তী স্কুল না থাকায় ঘটছে পড়ুয়াদের স্বপ্নভঙ্গ। অনেকেই লেখাপড়ার আঙিনা ছেড়ে গিয়ে ঘর গেরস্থালির কাজে জড়াচ্ছে, নয়ত পরিযায়ী শ্রমিক হিসাবে পাড়ি দিচ্ছে ভিন রাজ্যে। এলাকায় বাড়ছে স্কুলছুটের সংখ্যা।
ছাত্র-ছাত্রী থেকে স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকারা চান দ্রুত শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান হোক। রাজ্যের মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডু গোটা ঘটনার জন্য বিগত সরকারকেই দায়ী করেছেন। দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ করে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন মন্ত্রী। তবে ১৬ বছর ধরে চলা এই সমস্যার সমাধানে কতটা দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়, সেটাই এখন দেখার।