স্বাধীন ভারতের প্রথম সরকারে কেন কোনো পদ নেননি গান্ধীজি? ছুটির দিনে জেনে নিন এক অজানা ও চমকপ্রদ ইতিহাস

আজ ব্যাঙ্ক বন্ধ। বন্ধ স্কুল, আদালত এবং অধিকাংশ সরকারি অফিসও। কারণ একটাই—আজ গান্ধী জয়ন্তী। এই দিনটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ছবিটাও আমাদের প্রায় সকলেরই অতি পরিচিত। গোল চশমা, হাতে লাঠি, গায়ে সাদা চাদর আর এমন এক নাম, যা স্কুলের পাঠ্যবইয়ের প্রথম কয়েকটি অধ্যায়েই আমরা পড়ে ফেলি। কিন্তু ছুটির এই দিনে এমন একটি প্রশ্ন খুব কম মানুষই করেন, যা আসলে এক গভীর ভাবনার খোরাক জোগায়। ১৯৪৭ সালে ভারত যখন শেষ পর্যন্ত স্বাধীন হল, তখন মহাত্মা গান্ধী কি কোনো সরকারি পদ নিয়েছিলেন? উত্তর হলো—একটিও নয়! প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি তো দূরের কথা, কোনো মন্ত্রিত্ব বা নতুন সংসদেও তাঁর কোনো আসন ছিল না। ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটাতে যাঁর ভূমিকা দেশের ইতিহাসকে বদলে দিয়েছিল, সেই মানুষটিই নিজের স্বাধীন করে যাওয়া দেশে একটিও সরকারি পদে বসেননি। বিষয়টি এতটাই বিস্ময়কর যে, এক মুহূর্ত থেমে তা নিয়ে ভাবা জরুরি।
সক্রিয় রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাওয়া
ইতিহাস বলছে, গান্ধীজি তাঁর জীবনে মাত্র একবারই ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি হয়েছিলেন—১৯২৪ সালে। তখন কংগ্রেস কোনো সরকারি সত্তা ছিল না, বরং ছিল একটি বিশাল রাজনৈতিক আন্দোলন। এরপর নিজের দলেরও মূলত আনুষ্ঠানিক নেতৃত্বের বাইরে থাকতে শুরু করেন তিনি। ১৯৩৪ সালের মধ্যে সক্রিয় রাজনীতি থেকেও তিনি অনেকটাই সরে দাঁড়িয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর সমস্ত মনোযোগ নিবদ্ধ হয়েছিল গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা উন্নত করা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, চরকা ও দেশীয় বস্ত্র তৈরি এবং ভারতের সবচেয়ে নিপীড়িত মানুষের অধিকার রক্ষার মতো বিষয়গুলিতে। ১৯৪৭ সালের অগস্টে যখন দেশ স্বাধীন হলো, তখন ক্ষমতার কেন্দ্র নতুন দিল্লির কোনো জমকালো উদযাপনে ছিলেন না তিনি। বরং তিনি ছিলেন বাংলায়, যেখানে দেশভাগের সময় হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া ভয়ানক হিংসা থামানোর জন্য নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
ক্ষমতা ছাড়াই প্রভাব বিস্তারের আসল শক্তি
তাহলে প্রশ্ন আসতেই পারে, কোনো সরকারি পদ বা রাজনৈতিক ক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও তাঁর সেই অসামান্য প্রভাব এল কোথা থেকে? এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে এমন এক শক্তিতে, যা পরবর্তীকালে ভারতের সংবিধান দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য সুরক্ষিত করার চেষ্টা করেছে—নিজের আচরণের মাধ্যমে প্রভাব তৈরি করার ক্ষমতা এবং স্বাধীনভাবে সংগঠিত হওয়া, প্রতিবাদ করা ও অন্যকে নিজের যুক্তিতে রাজি করানোর অধিকার। গান্ধীর নৈতিক কর্তৃত্ব পুরোপুরি নির্ভর করত সাধারণ মানুষ তাঁকে স্বেচ্ছায় অনুসরণ করতে চাইছে কি না, তার ওপর। কোনো আইন বা সরকারি পদ মানুষকে তাঁর পেছনে হাঁটতে বাধ্য করেনি। মানুষ দেখেছেন তিনি কীভাবে জীবনযাপন করছেন, আর সেই জীবনই তাঁদের নিজেদের আচরণ বদলাতে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
পরিবর্তনের জন্য কি সবসময় পদের প্রয়োজন?
বিষয়টি বর্তমান সমাজের নিরিখে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ আমরা অনেকেই মনে মনে ধরে নিই যে, সত্যিকারের পরিবর্তন আনতে হলে আগে একটি চেয়ার, কোনো বিশেষ পদ বা ক্ষমতার ব্যাজ দরকার। কোনো শিক্ষার্থী ভাবে, ছাত্রনেতা না হলে কলেজ ক্যাম্পাসে কিছুই বদলানো সম্ভব নয়; কোনো সাধারণ নাগরিক মনে করেন, কাউন্সিলরের সাহায্য ছাড়া পাড়ার সামান্য রাস্তার সমস্যার সমাধান হতে পারে না; আবার কোনো কর্মী ভাবেন, ঊর্ধ্বতন কেউ হস্তক্ষেপ না করলে অফিসের পরিস্থিতির একচুলও নড়চড় হবে না। গান্ধীর জীবন অন্তত আংশিকভাবে এই প্রচলিত ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত কথা বলে।
উদাহরণস্বরূপ, আমাদের দেশের বিভিন্ন শহরের আবাসিক কল্যাণ সমিতিগুলিতে এমন অনেক মানুষ থাকেন, যাঁদের হাতে কোনো সরকারি পদ বা কাউকে জরিমানা করার আইনি ক্ষমতা না থাকলেও তাঁরা নিজেদের উদ্যোগে ভাঙা স্ট্রিটলাইট মেরামত করান, পার্ক পরিষ্কার রাখেন কিংবা এলাকার জলের সমস্যা সংশ্লিষ্ট দফতরের নজরে আনেন। তাঁদের হাতে কোনো সরকারি ক্ষমতা থাকে না, থাকে কেবল নাছোড়বান্দা মানসিকতা এবং প্রতিবেশীদের অকৃত্রিম আস্থা।
গান্ধীর পথের কঠিন বাস্তবতা
অবশ্যই এর অর্থ এই নয় যে সরকারি পদ বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ নয়। আইন তৈরি, বাজেট বরাদ্দ এবং সরকারি ব্যবস্থাকে সঠিকভাবে কার্যকর করার জন্য এমন মানুষ অবশ্যই প্রয়োজন, যাঁরা ব্যবস্থার ভিতর থেকে নীতিনির্ধারণ করবেন। গান্ধীর পথ কোনোভাবেই প্রতিষ্ঠানকে পাশ কাটানোর কোনো শর্টকাট রাস্তা ছিল না। বরং তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আসল পরিবর্তনের সূচনা সবসময় প্রতিষ্ঠানের ভিতর থেকেই হতে হবে—এমন কোনো কথা নেই।
তবে তাঁর এই পথের একটি অত্যন্ত কঠিন দিকও রয়েছে, যা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। গান্ধীর সেই পদ্ধতির জন্য প্রয়োজন ছিল বিপুল ধৈর্য, আত্মসংযম এবং ব্যক্তিগত ঝুঁকি নেওয়ার চরম সাহস। তাঁকে বারবার কারাবাস করতে হয়েছে, দীর্ঘ অনশন করতে হয়েছে, যেখানে তাঁর স্বাস্থ্য এমনকি জীবনের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছিল। মুদ্রার নোটে থাকা একটি পরিচিত মুখকে মনে রাখা যতটা সহজ, এই ধরনের অস্বস্তিকর প্রশ্ন নিয়ে ভাবা ততটাই কঠিন। বিংশ শতকের সবচেয়ে প্রভাবশালী ভারতীয়দের একজন যদি দেশ বদলে দেওয়ার জন্য কোনো সরকারি পদের প্রয়োজনই অনুভব না করে থাকেন, তবে আমরা বাকিরা আজ কীসের অপেক্ষায় বসে আছি? কখন আমাদের বিশ্বাস জন্মাবে যে, আমরাও একা নিজের জায়গা থেকে সমাজ বদলাতে পারি?