সাধারণ গামছাকেই বানিয়ে ফেললেন আন্তর্জাতিক ফ্যাশনের হটকেক! বাঙালি গৃহবধূর এই সাফল্যের গল্প চমকে দেবে

ছোটবেলার একটি সুপ্ত ইচ্ছে যে একদিন নিজের পরিচয়ের পাশাপাশি বহু মানুষের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে পারে, তার এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছেন শিলিগুড়ির বাঙালি গৃহবধূ দেবী। ছোটবেলা থেকেই জামাকাপড় তৈরি ও টেলারিংয়ের প্রতি ঝোঁক ছিল তাঁর। সেই সময় টেলারিংয়ের কাজ কিছুটা শিখেওছিলেন। কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতিতে প্রথাগতভাবে ফ্যাশন ডিজাইনিং নিয়ে পড়াশোনা করার সুযোগ হয়নি। অল্প বয়সে বাবার অসুস্থতা এবং তার পরেই বিয়ে—জীবনের গতিপথ বদলে দিয়েছিল। তবে এত বাধা সত্ত্বেও থামেনি তাঁর স্বপ্ন দেখা। বরং শ্বশুরবাড়ির উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় নতুন করে ফ্যাশন ডিজাইনিং নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন তিনি। সেখান থেকেই শুরু হয় দেবীর এক নতুন লড়াই।

গামছাকে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করার পেছনের গল্প
দেবীর কাজকে সমসাময়িক অন্যান্য ডিজাইনারদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে তুলেছে তাঁর একটি অভিনব ভাবনা। বাংলার ঐতিহ্যবাহী গামছাকে একেবারে আধুনিক ফ্যাশনের রূপ দিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন তিনি। বাংলা ও অসমের গামছা ব্যবহার করে তিনি কেবল আধুনিক পোশাকই তৈরি করছেন না, বরং সেই কাপড় দিয়েই নানা ধরনের আকর্ষণীয় গয়না এবং ফ্যাশন সামগ্রী তৈরি করছেন।

তাঁর এই সৃষ্টিশীল কাজ আজ পৌঁছে গিয়েছে আন্তর্জাতিক মঞ্চেও। বিভিন্ন ফ্যাশন শোতে গামছা দিয়ে তৈরি তাঁর অসাধারণ পোশাক প্রদর্শিত হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী এই কাপড়কে বেছে নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে দেবী জানান, অসমে শুভ কাজের সঙ্গে গামছার নিবিড় যোগ রয়েছে। সেই ঐতিহ্যকে আধুনিক ফ্যাশনের সঙ্গে জুড়ে দেওয়াটাই তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল, যাতে গামছা কেবল দৈনন্দিন ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে।

সংগ্রামের দিনগুলি ও বর্তমান সাফল্য
দীর্ঘ পরিশ্রম, নানা বাধা এবং ধৈর্যের সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে ফ্যাশন দুনিয়ায় নিজের শক্ত ভিত তৈরি করেছেন দেবী। ২০১৬ সাল থেকে এই পেশায় তাঁর পথচলা শুরু হয়। প্রায় দু’বছর ধরে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর ২০১৮ সাল থেকে তিনি পুরোদমে এই কাজে নেমে পড়েন। বর্তমানে শিলিগুড়িতে তাঁর নিজস্ব স্টুডিও রয়েছে। সেখানে পোশাক তৈরির পাশাপাশি তিনি ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ের ক্লাসও পরিচালনা করেন। অর্থাৎ নিজের কাজের পরিসর বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের আগ্রহীদেরও এই শিল্পে দক্ষ করে তুলছেন তিনি।

নিজের এই অদম্য যাত্রা প্রসঙ্গে দেবী বলেন, “অনেক পরিশ্রম করে আজ এই জায়গায় পৌঁছেছি। আমি ফ্যাশন নিয়ে কী কী কাজ করছি, সেটা মানুষকে বোঝাতেই অনেকটা সময় লেগেছে। তবে এখন বলতে পারি, স্বপ্ন দেখা উচিত। স্বপ্ন দেখলে তা পূরণ হবেই।”

মহিলাদের স্বনির্ভর করার ব্রত
শুধু নিজের সফল কেরিয়ার তৈরি করাই নয়, এর পাশাপাশি সমাজের প্রতি নিজের দায়িত্বও পালন করে চলেছেন দেবী। বিশেষ করে গ্রামের প্রত্যন্ত এলাকা এবং চা-বাগান অঞ্চলের মহিলাদের স্বনির্ভর করে তোলার এক অনন্য উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। নিজে যা শিখেছেন, সেই কর্মদক্ষতা ও কাজের কৌশল তিনি গ্রামের মহিলাদের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছেন, যাতে তাঁরাও কাজ শিখে নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারেন। ঐতিহ্যবাহী গামছাকে বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দেওয়া এবং নারী শক্তির স্বনির্ভরতার এই দুই ভাবনাকে হাত ধরে দেবী আজ হয়ে উঠেছেন এক প্রকৃত অনুপ্রেরণা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *