এবার বিশ্বজয়ে বাংলার রসগোল্লার মতো ইউপির মিষ্টি-চাট! ভিনদেশে ভাগ্য বদলাচ্ছে দেশীয় খাবারের

শিলালিখ একসময় ঘষে মুছে যায়, প্রাচীন ইমারতও জীর্ণ হয়ে পড়ে, কিন্তু সুস্বাদু খাবারের ঐতিহ্য ও জাদুকরি স্বাদ চিরকাল মানুষের হাত ধরে বেঁচে থাকে। উত্তরপ্রদেশের আনাচে-কানাচে লুকিয়ে রয়েছে এমনই শত শত পদের এক বিশাল রত্নভাণ্ডার। বেনারসের সুস্বাদু মলাইয়ো, লখনউয়ের বিখ্যাত চাট, আগ্রার পেঠা, মথুরার পেড়া, কনৌজের খাঁটি গোলাপ জল কিংবা হাতরসের হিঙ্গ—এগুলি কেবল সাধারণ কোনো খাবার বা উপাদান নয়, বরং একেকটি ইতিহাসের জীবন্ত দলিল। এতদিন এই ঐতিহ্যবাহী পদগুলি পাড়ার গলি, ছোট মেলা কিংবা ভ্রমণপিপাসুদের স্মৃতিচারণার মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে এবার প্রথমবারের মতো সেগুলিকে বিশ্ব বাণিজ্যের আঙিনায় একেবারে পেশাদার ও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।

সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় ‘ওয়ান ডিস্ট্রিক্ট-ওয়ান কুজিন’ বা এক জেলা-এক রন্ধনশৈলী (ODOC) ধারণাকে কেন্দ্র করে এক যুগান্তকারী বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। তাঁর পরিষ্কার ঘোষণা, ঐতিহ্য কোনো বোঝা নয়, বরং বড় মূলধন। আর প্রথা বা পরম্পরা কোনোভাবেই পিছিয়ে পড়ার প্রতীক নয়, বরং আত্মনির্ভরতার শক্ত ভিত।

বিশ্বমঞ্চে লোকাল থেকে গ্লোবাল: এই অভিনব চিন্তাভাবনাটি মূলত সরকারের অত্যন্ত সফল প্রকল্প ‘ওয়ান ডিস্ট্রিক্ট-ওয়ান প্রোডাক্ট’ (ODOP)-এরই এক সুদূরপ্রসারী সম্প্রসারণ। এর মূল নীতিটি একদম স্পষ্ট—যখন কোনো নির্দিষ্ট জেলার নিজস্ব ঐতিহ্যকে ব্র্যান্ডিং, বাজার এবং নীতিগত সহায়তা দেওয়া হয়, তখন একজন সাধারণ কারিগরের সাধারণ মেধা শিল্পে রূপান্তরিত হয় এবং স্থানীয় পণ্য আন্তর্জাতিক পণ্যের রূপ নেয়। ‘ভোকাল ফর লোকাল’ মন্ত্রটি আজ উত্তরপ্রদেশের ৭৫টি জেলার উদ্যোক্তাদের জন্য একটি বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনায় পরিণত হয়েছে। সদ্য সমাপ্ত এই বাণিজ্য মেলায় বিশ্বের প্রায় ৯০টি দেশ থেকে ৬০০-রও বেশি নামী ক্রেতা উপস্থিত হয়ে ইউপির এই অর্থনৈতিক শক্তির বাস্তব রূপ প্রত্যক্ষ করেছেন।

গুণগত মান ও লজিস্টিকসের আধুনিক ছোঁয়া: বিশ্ববাজারে বর্তমানে খাঁটি এবং প্রাকৃতিক খাদ্যপণ্যের চাহিদা আকাশছোঁয়া। প্রবাসী ভারতীয়দের বিশাল বাজার, বিশ্বজুড়ে ভারতীয় খাবারের ক্রমবর্ধমান গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রিমিয়াম ও অর্গানিক পণ্যের প্রতি ক্রেতাদের ঝোঁক—এই সমস্ত ইতিবাচক দিকগুলিই ওডিওসি (ODOC)-এর পক্ষে জোরালো ভূমিকা পালন করছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকা—আজকের আন্তর্জাতিক ক্রেতারা কেবল মুখের স্বাদ চান না, তাঁরা পণ্যের গুণগত মান, খাঁটি ভাব এবং আস্থার নিশ্চয়তা চান।

উপির ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলির মধ্যে এই সমস্ত গুণই বিদ্যমান। এখন কেবল প্রয়োজন সেগুলিকে উন্নত প্যাকেজিং, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এবং আধুনিক লজিস্টিকস ব্যবস্থার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া। জেবর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং অত্যাধুনিক এক্সপ্রেসওয়ে নেটওয়ার্কের মতো বিশাল পরিকাঠামো এই পুরো প্রক্রিয়ায় মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে। চ্যােম্বর অফ ফুড প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রিজ (CFPIA)-এর সভাপতি রাজ কুমার भगत-এর মতে, ওডিওপি-র আওতায় জিআই (GI) ট্যাগ পাওয়া পণ্যের একটি বড় অংশই খাদ্যদ্রব্য, যা এই নতুন উদ্যোগকে আরও বেশি গতি জোগাবে।

কৃষক থেকে হালুইকর—অর্থনৈতিক পালাবদল: ওডিওসি কেবল অর্থনৈতিক কিছু পরিসংখ্যান বা বড় অঙ্কের লাভের হিসাব নয়; এটি এমন এক দূরদর্শী ভাবনা যা বিশ্বাস করে যে প্রকৃত উন্নয়নের পথ নিজের শেকড়কে আঁকড় ধরেই তৈরি হয়। এই পুরো উৎপাদন শৃঙ্খলার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছেন গ্রামের সাধারণ হালুইকর, চাষি, দুধ উৎপাদক এবং স্বনির্ভর গোষ্ঠীর নারী উদ্যোক্তারা। এর মাধ্যমে সংস্কৃতি এবং অর্থনীতি একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠে। এতদিন যে সমস্ত ঐতিহ্যবাহী খাবার বা মিষ্টান্ন শুধুমাত্র স্থানীয় মেলা কিংবা পর্যটকদের গণ্ডির মধ্যে বন্দি ছিল, বাণিজ্য মেলার কল্যাণে সেই সীমানা এখন পুরোপুরি ভেঙে গেছে।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ফুড চেইন অপারেটর, বড় রিটেল কোম্পানি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রতিনিধিরা যখন সরাসরি এই দেশীয় পণ্যের স্বাদ নিচ্ছেন এবং এর পেছনের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা অনুধাবন করছেন, তখনই ‘স্ট্রিট ফুড’-এর মতো সীমিত ধারণার অবসান ঘটছে। নিজের কসবার ছোট দোকানে সীমিত থাকা একজন সাধারণ মিষ্টি বিক্রেতাও আজ সাহস করে ভাবতে পারছেন যে তাঁর হাতের তৈরি পদ একদিন সুদূর আমেরিকা বা ইউরোপের সুপারমার্কেটের তাকে শোভা পাবে। এই মানসিক বদলই আদতে এক বিরাট উদ্যোক্তা বিপ্লব।

চারটি শক্ত স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: শুধুমাত্র চমৎকার স্বাদের জোরে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকা অসম্ভব। তাই পণ্যের মান, সুরক্ষা এবং ধারাবাহিকতার কষ্টিপাথরে প্রতিটি পদকে যাচাই করা হচ্ছে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই রাজ্য সরকার এবং এমএসএমই (MSME) বিভাগ একটি শক্তিশালী সহায়তা কাঠামো তৈরি করেছে, যা প্রধানত চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে:

১. প্যাকেজিং ও শেলফ-লাইফ: ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি ও খাবারের দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ার সমস্যা দূর করতে সেন্ট্রাল ফুড টেকনোলজি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (CFTRI)-এর সহযোগিতায় বিশেষ প্রযুক্তি আনা হচ্ছে, যার সাহায্যে কোনো ক্ষতিকর প্রিজার্ভেটিভ ছাড়াই পণ্যগুলি দীর্ঘকাল তাজা রাখা সম্ভব হবে। ২. আন্তর্জাতিক মান ও সার্টিফিকেশন: আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করতে হলে এফএসএসএআই (FSSAI), HACCP, আইএসও (ISO) সার্টিফিকেশন এবং অর্গানিক বা জিআই ট্যাগ অত্যন্ত জরুরি। স্থানীয় কারিগর ও প্রস্তুতকারকদের এই সমস্ত শংসাপত্র পাওয়ার জন্য আর্থিক ও কারিগরি দিক থেকে সমস্ত রকম সাহায্য করা হচ্ছে। ৩. ব্র্যান্ডিং ও ডিজিটাল মার্কেটিং: আজকের ক্রেতারা কেবল পণ্য কেনেন না, বরং সেই পণ্যের পেছনের গল্পটাও জানতে চান। কিউআর কোড (QR Code)-ভিত্তিক প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে ক্রেতারা খুব সহজেই পণ্যের উৎস, উপাদান এবং তার বিশুদ্ধতার সঠিক তথ্য জেনে নিতে পারবেন। ৪. রপ্তানি সহায়তা ও লজিস্টিকস: রপ্তানি প্রক্রিয়াকে সহজ করা, এক্সপোর্ট ক্রেডিট सब्सिडी এবং শক্তিশালী কোল্ড-চেইন পরিকাঠামো গড়ে তোলা এর মূল অঙ্গ। জেবর বিমানবন্দর ও এক্সপ্রেসওয়ের কল্যাণে খুব কম সময়ে perishable বা দ্রুত পচনশীল খাদ্যদ্রব্য বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে পৌঁছে দেওয়া এখন অনেক সহজ হয়েছে।

চ্যালেঞ্জ যে একেবারে নেই, এমন নয়। ঋণ ও ভর্তুকির প্রক্রিয়া আরও সরল করা, মান বজায় রাখা এবং নিয়মিত পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই সমস্ত ছোটবড় বাধা সত্ত্বেও ওডিওসি-র সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। অল্প পুঁজি এবং দীর্ঘদিনের পারিবারিক দক্ষতার ওপর ভর করে যে হাতে-কলমে কর্মসংস্থান তৈরি হয়, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প তার মধ্যে অন্যতম সেরা মাধ্যম।

কোনো একটি জেলার বিশেষ কোনো খাবার যখন বিশ্বমানের ব্র্যান্ডে পরিণত হয়, তখন তার সুফল পান চাষি, দুধ ও ফলমূল সরবরাহকারী, হালুইকর, প্যাকেজিং কর্মী থেকে শুরু করে পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত সাধারণ মানুষও। এর হাত ধরেই নতুন করে প্রসার লাভ করছে ‘ফুড ট্যুরিজম’ বা খাদ্য পর্যটন। আগ্রার পেঠা বা বেনারসের লসি চেখে দেখার আকর্ষণে ভিনদেশি পর্যটকরা যখন সশরীরে সেই শহরের অলিতে-গলিতে এসে পৌঁছান, তখন সামগ্রিকভাবে লাভবান হয় পুরো রাজ্যের পর্যটন শিল্পই। ওডিওপি যেমন একসময় হাতের কারুশিল্পকে বিশ্ববাজারে সঠিক সম্মান দিয়েছিল, ঠিক একইভাবে ওডিওসি বাংলার রসগোল্লার মতো উত্তরপ্রদেশের এই সমৃদ্ধ স্বাদের ঐতিহ্যকেও বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিতে চলেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *