এমন মারাত্মক প্রতারণা আগে দেখেনি দেশ! ক্যানসার আক্রান্ত ৭৫ বছরের বৃদ্ধার বাড়ি-গয়না সব লুঠ করল সাইবার জালিয়াতরা

আধুনিক প্রযুক্তির যুগে সাইবার অপরাধের নিত্যনতুন ফন্দিফিকির মাথা ঘুরিয়ে দিচ্ছে বিশেষজ্ঞদেরও। তবে সাম্প্রতিক অতীতে এ দেশের মাটিতে এমন ভয়াবহ ও সুপরিকল্পিত প্রতারণার ঘটনা কার্যত বিরল। সিবিআই এবং এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ED) ভুয়ো আধিকারিক সেজে ৭৫ বছরের এক ক্যানসার আক্রান্ত বৃদ্ধার সর্বস্ব লুঠ নেওয়ার অভিযোগ উঠল। দীর্ঘ ২২ দিন ধরে দফায় দফায় ব্ল্যাকমেল করে ওই বৃদ্ধার ২ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের বাড়ি, গয়না ও নগদ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারকরা। শুধু ভার্চুয়ালি নয়, একেবারে বাড়িতে সশরীরে হানা দিয়ে এই সর্বনাশা কাণ্ড ঘটিয়েছে সাইবার অপরাধীরা।
কীভাবে ফাঁদে ফেলা হয়েছিল? দিল্লির বাসিন্দা ওই প্রবীণা একা থাকেন। গত ৬ এপ্রিল তাঁর ল্যান্ডলাইন নম্বরে একটি অচেনা ফোন আসে। ফোনের ওপারে থাকা ব্যক্তিরা নিজেদের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই ও ইডির অফিসার বলে পরিচয় দেয়। তাদের দাবি ছিল, ওই মহিলার ফোন নম্বরটি একটি মানি লন্ডারিং মামলার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। সেই সময় ক্যানসারের চিকিৎসা চলাকালীন চরম মানসিক চাপের মধ্যে ছিলেন ওই বৃদ্ধা। একা থাকার সুযোগ নিয়ে প্রতারকরা তাঁকে অনলাইন অভিযোগ দায়েরের নামে হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিও কলে যুক্ত হতে বলে।
অভিযোগ, ভিডিও কলে থাকা ব্যক্তিরা পুলিশের সুনির্দিষ্ট পোশাক পরে থাকত, যার ফলে মহিলা পুরোপুরি বিশ্বাস করতে বাধ্য হন যে তিনি সত্যি সত্যিই আইনরক্ষকদের সঙ্গেই কথা বলছেন। এরপর শুরু হয় নিখুঁত মানসিক নিগ্রহ।
২২ দিন ধরে লাগাতার ব্ল্যাকমেল ও নজরদারি: প্রতারকরা তাঁকে হুমকি দিয়ে জানায়, ৩০ মিনিটের মধ্যে তাঁকে ও তাঁর সন্তানদের গ্রেফতার করা হবে। ইডি তাঁর সন্তানদের কাউকে ছাড়বে না এবং জামিনও মিলবে না বলে ভয় দেখানো হয়। মামলাটি ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র সঙ্গে জড়িত বলে দাবি করে কাউকে একবিন্দু তথ্য জানাতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।
এর পর শুরু হয় সম্পদ হাতানোর পালা। প্রতারকদের নির্দেশে বসন্ত কুঞ্জের একটি ব্যাঙ্ক থেকে প্রথমে ৩ লক্ষ টাকা ট্রান্সফার করান মহিলা। পরের দিন অর্থাৎ ৭ এপ্রিল একটি সংস্থার অফিসে গিয়ে নিজের ৮৩.৫ গ্রাম সোনা বন্ধক রেখে প্রায় পৌনে পাঁচ লক্ষ টাকার গোল্ড লোন নেন এবং সেই অর্থও তুলে দেন সাইবার জালিয়াতদের অ্যাকাউন্টে।
সোজা বাড়িতে হানা দিল প্রতারকরা: অনলাইন প্রতারণার গণ্ডি পেরিয়ে অপরাধীরা সরাসরি ওই বৃদ্ধার বাড়িতে চড়াও হয়। গত ১৩ এপ্রিল ‘সুশান্ত কুমার’ নামের এক ব্যক্তি ওই প্রবীণার বাড়িতে গিয়ে সমস্ত আসল সম্পত্তির দলিল ও তার প্রতিলিপি তুলে নেয়। এর পর ১৫ এপ্রিল ক্রেতা সেজে অনিল কাপুর ও সাক্ষী প্রবীণ চাড্ডা নামের আরও দু’জন ওই বাড়িতে যায়। অন্ধকারে রেখে জোর করে বাড়ি বিক্রির একটি আগাম চুক্তিতে ওই বৃদ্ধার সই করিয়ে নেওয়া হয়।
মেয়ের সন্দেহে প্রকাশ্যে এল পর্দাফাঁস: পুরো ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে নেদারল্যান্ডস প্রবাসী মেয়ের একটি ফোন কলের মাধ্যমে। গত ২৭ এপ্রিল মেয়ে রাধিকা রালহান মাকে ভিডিও কল করলে তিনি দেখতে পান, মায়ের সঙ্গে গাড়িতে একজন অপরিচিত ব্যক্তি বসে রয়েছেন এবং মা অত্যন্ত আতঙ্কিত অবস্থায় আছেন। মেয়ের সন্দেহ হওয়ায় তিনি অবিলম্বে মাকে পুলিশে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
তদন্তে নেমে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, এই ঘটনার পিছনে কম্বোডিয়া থেকে পরিচালিত কোনো আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধ চক্রের হাত রয়েছে। শুধু সোশ্যাল মিডিয়া বা ফোনের পর্দার আড়ালে নয়, খোদ বাড়িতে গিয়ে প্রবীণার সম্পত্তি হাতানোর এই ভয়ঙ্কর ঘটনা গোটা দেশজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।