শুধু লিভার নয়, এবার চর্বি জমছে সোজা হার্টেও! নিঃশব্দে ঘনীভূত এই মারাত্মক বিপদের লক্ষণগুলি জানেন কি?

ফ্যাটি লিভারের নাম তো আমরা প্রায় সবাই শুনেছি, কিন্তু বর্তমান দিনে শরীরের আরেকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে অতিরিক্ত চর্বি জমার সমস্যা চরম আকার ধারণ করছে। আর তা হলো—‘ফ্যাটি হার্ট’। হৃদযন্ত্রের চারপাশে বা তার পেশিকোষের ভেতরে অতিরিক্ত চর্বি জমা হওয়ার এই মারণ সমস্যা বর্তমানে বয়স নির্বিশেষে মানুষের মধ্যে দ্রুত বাড়ছে। আইএলএস হাসপাতালের বিশিষ্ট কার্ডিওলজিস্ট ডা. সৌম্যজিৎ সাহার মতে, হৃদযন্ত্রে চর্বি জমার এই প্রক্রিয়াটি বেশিরভাগ সময়ই একদম চুপিসারে ঘটে এবং এটি বড় ধরনের কার্ডিওভাসকুলার সমস্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
ফ্যাটি হার্ট ও ফ্যাটি লিভারের পার্থক্য
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে চর্বি মূলত লিভারের কোষগুলির ভেতরে জমা হয়। অন্যদিকে, ‘ফ্যাটি হার্ট’-এর ক্ষেত্রে চর্বি মূলত হৃদযন্ত্রের বাইরের পৃষ্ঠতল এবং পেশিকোষের ভেতরে (যেমন এপিকার্ডিয়াল ফ্যাট ও কার্ডিয়াক স্টিয়াটোসিস হিসেবে) জমতে শুরু করে। মেটাবলিক ডিসঅর্ডার, স্থূলতা এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের মতো অভিন্ন কারণে এই দুই সমস্যা প্রায়শই হাত ধরাধরি করে চলে।
কেন হয় এই রোগ? ঝুঁকিতে কারা?
-
অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা
-
কায়িক শ্রমহীন ও অলস জীবনযাপন
-
টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স
-
মেটাবলিক সিন্ড্রোম এবং লিপিডের অস্বাভাবিকতা (ডিসলিপিডেমিয়া)
-
অতিরিক্ত মদ্যপান
‘ফ্যাটি হার্ট’-এর প্রধান লক্ষণ ও উপসর্গ
হৃদযন্ত্রের চারপাশে চর্বি জমার ফলে শরীরে নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে। যার মধ্যে প্রধান লক্ষণগুলি হলো—
-
শ্বাসকষ্ট: সামান্য কাজ বা বিশ্রামের সময়েও শ্বাস নিতে সমস্যা হওয়া।
-
দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি: সামান্য পরিশ্রমেই স্ট্যামিনা কমে যাওয়া এবং সবসময় ক্লান্তিবোধ করা।
-
বুকে অস্বস্তি বা এনজাইনা: বুকে চাপ, আঁটসাঁট ভাব বা হালকা থেকে তীব্র ব্যথা, যা অনেক সময় পিঠ বা ঘাড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
-
শরীরের ফোলাভাব (এডিমা): রক্তসঞ্চালনে ব্যাঘাত ঘটায় পা, গোড়ালি বা পায়ের পাতায় ফোলাভাব দেখা দেওয়া।
-
অনিয়মিত হৃদস্পন্দন: হঠাৎ বুক ধড়ফড় করা বা নাড়ির গতি বেড়ে যাওয়া।
-
মাথা ঘোরা ও পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা: অক্সিজেন সরবরাহে ঘাটতির কারণে মাথা ঝিমঝিম করা, বমি ভাব বা ক্ষুধামন্দা দেখা দেওয়া।
কোন খাবারগুলি হার্টের মারাত্মক ক্ষতি করছে?
আমাদের ভুল খাদ্যাভ্যাস এবং প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রতি আসক্তি শরীরের ভিসেরাল ফ্যাট বাড়াতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নেয়। যে খাবারগুলি থেকে দূরত্ব বজায় রাখা জরুরি—
-
তরল শর্করা ও মিষ্টি পানীয়: সোডা, এনার্জি ড্রিংক ও প্যাকেটজাত জুস লিভারে উচ্চ ফ্রুক্টোজ তৈরি করে চর্বিতে রূপান্তরিত করে।
-
অত্যধিক প্রক্রিয়াজাত খাবার: সাদা রুটি, পেস্ট্রি, চিপস রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে পেরিকার্ডিয়াল ফ্যাট বা হার্টের চর্বি বৃদ্ধি করে।
-
ট্রান্স ফ্যাট: ডুবো তেলে ভাজা ফাস্ট ফুড রক্তনালীর মারাত্মক ক্ষতি করে।
-
লাল মাংস ও প্রক্রিয়াজাত মাংস: সালামি, সসেজ বা অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত মাংসে থাকা স্যাচুরেটেড ফ্যাট ক্ষতিকর এলডিএল (LDL) কোলেস্টেরল বাড়ায়।
-
অতিরিক্ত মদ্যপান: অতিরিক্ত মদ্যপানের ফলে লিপিড বিপাক ব্যাহত হয়, যা হার্টের আবরণের চারপাশে চর্বি জমার মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে দেয়।
প্রতিরোধের উপায় কী?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, জীনগত বা বংশগত কারণ থাকলেও জীবনযাত্রার সঠিক নিয়ন্ত্রণ ও সুষম খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে হার্টে জমে থাকা অতিরিক্ত চর্বি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এজন্য ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি রক্তে শর্করা, উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল বশে রাখতে হবে। দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় নুন ও চিনির পরিমাণ কমিয়ে প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি ও ফল রাখুন। পাশাপাশি ধূমপান এবং অতিরিক্ত মদ্যপান থেকে শতহস্ত দূরে থাকলেই সুস্থ রাখা সম্ভব আপনার অমূল্য হৃদযন্ত্রটিকে।