আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মারাত্মক প্রভাব! আকাশছোঁয়া দামে দ্বিগুণ হল ভারত সহ এশিয়ার এলএনজি বিল

আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনার আঁচ এসে পড়েছে এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর ওপর। এর ফলে এশিয়ার দেশগুলোর জ্বালানি খরচ দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ব্লুমবার্গ-এর একটি চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। সংঘাতের জেরে ভারত ও পাকিস্তানসহ এশিয়ার উদীয়মান দেশগুলির এলএনজি (LNG) আমদানির বিল এখন দ্বিগুণ ছাড়িয়ে গেছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, মার্কিন-ইরান উত্তেজনা শুরুর পর থেকে ভারত এবং এশিয়ার চার প্রধান এলএনজি ক্রেতা দেশ স্পট লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাসের পেছনে মোট ৭.৪ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। এক বছর আগে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির (Long-term Contract) মাধ্যমে কেনা একই পরিমাণ সরবরাহের খরচের তুলনায় এই অঙ্ক দ্বিগুণেরও বেশি।
এশিয়ার দেশগুলির ওপর আর্থিক চাপ:
চীন ছাড়া এশিয়ার অন্যান্য প্রধান উদীয়মান বাজার—যেমন ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড এবং ভিয়েতনাম—স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়েছে। হরমুজ প্রণালী (Ormuz Strait) দিয়ে এলএনজি চালানে বড় ধরনের বাধা আসায় পূর্বের চুক্তি অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং দাম বহুগুণ বেড়ে যায়। ব্লুমবার্গ-এর রিপোর্ট জানাচ্ছে, এই পাঁচ দেশ স্পট এলএনজিতে ৭.৪ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে, অথচ আগের বছর একই সময়ে লং-টার্ম চুক্তির মাধ্যমে এই সমপরিমাণ গ্যাসের পেছনে খরচ হয়েছিল মাত্র ৩.১ বিলিয়ন ডলার। এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্পের কাজে প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল উন্নয়নশীল দেশগুলির অর্থনীতিতে তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে কাতার থেকে জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে, যা এই সংকটের মূল কারণ।
বিকল্প জ্বালানির খোঁজে এশিয়া:
জ্বালানির চড়া দামের কারণে এশিয়ার দেশগুলি এখন আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সোলার, উইন্ড এনার্জি, কয়লা, পারমাণবিক শক্তি এবং অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদনের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।
পাকিস্তান ও বাংলাদেশ: পাকিস্তান সোলার ও জলবিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে, কাতারের গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হওয়ায় বাংলাদেশ বিকল্প ব্যবস্থার পেছনে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ করেছে এবং রুফটপ সোলার সিস্টেমে জোর দিচ্ছে।
থাইল্যান্ড ও ভারত: থাইল্যান্ড ২০৫০ সালের মধ্যে অন্তত ৬৫ শতাংশ বিদ্যুৎ রিনিউয়েবল এনার্জি থেকে পাওয়ার পরিকল্পনা করেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মন্তব্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এলএনজির দাম অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলি পুনরায় কয়লার দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হচ্ছে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার (IEA) পূর্বাভাস অনুযায়ী, গ্যাসের চড়া দামের জেরে চলতি বছর বিশ্বে কয়লার ব্যবহার রেকর্ড গড়ে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছাতে পারে।
ভবিষ্যৎ রণকৌশলে বদল:
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এলএনজি ক্রেতারা এখন তাঁদের সরবরাহকারীদের বৈচিত্র্যময় করার কথা ভাবছেন। ম্যাককিনসির একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রায় ৮০ শতাংশ ক্রেতা আগামী দিনে নিজেদের ক্রয়ের কৌশল পরিবর্তন করতে চলেছেন। ভবিষ্যতের এই অনিশ্চয়তা এবং আকাশছোঁয়া দামের জেরে ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলিতে গত পাঁচ বছরে প্রায় ৫২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ৪৭টি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ স্থগিত বা বাতিল করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, একের পর এক ভূ-রাজনৈতিক সংকট এশিয়ান দেশগুলিকে তাদের দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নীতি নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।