শব্দহীন কান্না আর কুশ পুতুলে শেষকৃত্য! নেপালের প্রলয়ঙ্করী বন্যায় নিখোঁজ হাজার হাজার মানুষের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় কাঁপছে মন

নেপালের প্রলয়ঙ্করী ও বিধ্বংসী বন্যার পর পেরিয়ে গেছে বেশ কিছুদিন, কিন্তু এখনও নিখোঁজ রয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। প্রিয়জনদের ফিরে আসার ক্ষীণ আশাটুকুও যখন তিলে তিলে ফুরিয়ে আসছে, তখন চরম মানসিক অবসাদ আর দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটাতে এক বুক বেদনা নিয়ে এক অন্য পথ বেছে নিয়েছেন স্বজনেরা। মৃতদেহের দেখা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত তাদের মৃত বলে ধরে নিয়ে কুশ ঘাসের তৈরি পুতুল কিংবা কফিনের প্রতিরূপ ব্যবহার করে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করছেন পরিবারগুলি। ধর্মীয় আচার পালনের পাশাপাশি এই হৃদয়বিদারক পদক্ষেপটি শোকার্ত পরিবারগুলোকে কিছুটা মানসিক শান্তি দেওয়ার একমাত্র উপায় হয়ে উঠেছে।
বিবিসির একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, পারসা জেলার পোখারিয়া-৭ এর বাসিন্দা সোনলাল পণ্ডিত নুয়াকোটের দেবীঘাটে বাড়ি নির্মাণের ঠিকাদার হিসেবে কাজ করতেন। বন্যার দিন তিনি বাজারে কর্মরত ছিলেন। পরিবারের ভাষ্যমতে, হড়পা বানের জলের শব্দ শুনে সহকর্মীরা পালাতে সক্ষম হলেও, হাঁটু ভাঙার কারণে ক্রাচের সাহায্যে চলা সোনলালকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। তাঁর ভাই পান্নালাল জানান, কিছু ভিডিওতে সোনলালকে হাঁটু পর্যন্ত জলে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেলেও তারপর থেকে তাঁর আর কোনো খোঁজ মেলেনি। অবশেষে ঘটনার পাঁচ দিন পর কুশ পুতুল তৈরি করে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করে পরিবার। একইভাবে সাংবাদিক নিরঞ্জন পাউডেল তাঁর বাবা-মা, চাচা ও বোনসহ পরিবারের পাঁচ নিখোঁজ সদস্যের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন।
ধর্মশাস্ত্রের বিধান ও শাস্ত্রীয় নিয়ম:
নেপাল সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মতত্ত্ববিদ ও অধ্যাপক দেবমণি ভট্টরাইয়ের মতে, ‘ধর্মসিন্ধু’ এবং ‘নির্ণয়সিন্ধু’র মতো পবিত্র ধর্মগ্রন্থে কুশ পুতুল বা দোলনায় মৃতদেহ দাহ করার পদ্ধতির স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। যদি মৃত্যু সরাসরি প্রত্যক্ষ করা যায় (যেমন ব্যক্তির জলে ভেসে যাওয়ার কোনো ভিডিও থাকে), তবে মৃতদেহ খুঁজে পাওয়ার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। এমন ক্ষেত্রে দশ দিনের মধ্যেই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়। তবে যেসব পরিবারের মনে এখনও ক্ষীণ আশা বেঁচে আছে, তারা ১০ থেকে ১৫ দিন কিংবা সরকারের ডিএনএ রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করতে পারেন।
রাজধানীর কাঠমান্ডুর বিখ্যাত পশুপতি আর্যঘাটেও এই ধরনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পশুপতি এলাকা উন্নয়ন ট্রাস্টের তথ্য কর্মকর্তা সূর্য ভাট জানান, কুশ ঘাসের মূর্তি ব্যবহার করে ইতিমধ্যেই একাধিক মানুষের শবদাহ করা হয়েছে। জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নেপালের এই ভয়াবহ বন্যায় এখনও পর্যন্ত ১,২৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৪,২০০ জনেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
বিভিন্ন ধর্মে ভিন্ন আচার ও মানসিক শান্তি:
হিন্দুধর্মের পাশাপাশি অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যেও শুরু হয়েছে শোক পালনের বিশেষ আচার-অনুষ্ঠান। ওয়ার্ল্ড বুদ্ধিস্ট ফোরামের সভাপতি আচার্য ছেওয়াং রিগজিন জানিয়েছেন, বৌদ্ধ বিশ্বাস অনুসারে মৃত ব্যক্তিরা ৪৯ দিন পর্যন্ত পুনর্জন্ম লাভ করেন না, তাই সপ্তম, একুশতম এবং উনপঞ্চাশতম দিনের অনুষ্ঠানগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, খ্রিস্টান সম্প্রদায় সরকারিভাবে নিশ্চিতকরণ না পাওয়া পর্যন্ত পুনর্মিলনের জন্য বিশেষ প্রার্থনা করছেন।
মনোবিজ্ঞানী অঞ্জন কুমার ধাকালের মতে, কুশ পুতুলের মাধ্যমে এই ধরনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করা শোকার্ত পরিবারকে এক অদ্ভুত মানসিক শান্তি ও সান্ত্বনা দেয়। প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা সহ্য করা অসম্ভব হলেও, এই আকস্মিক দুর্যোগের মাঝে ধর্মীয় এই আচার-অনুষ্ঠান পরিবারগুলিকে কিছুটা হলেও মনের জোর জোগাচ্ছে। মানবিক দিক বিবেচনা করে পশুপতি এলাকা উন্নয়ন ট্রাস্টও বন্যায় নিখোঁজদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য বিনামূল্যে যাবতীয় ব্যবস্থা করেছে।