কিয়েভ থেকে ওডেসা জুড়ে রক্তগঙ্গা! ১৭৫টি মিসাইল-ড্রোন নিয়ে ইউক্রেনে সবথেকে বড় ধ্বংসলীলা চালাল রাশিয়া

সোমবার গভীর রাত থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত ইউক্রেনজুড়ে একযোগে অত্যন্ত শক্তিশালী ও বিধ্বংসী আকাশপথে হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। রাজধানী কিয়েভ এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় ওডেসা ছিল এই ভয়াবহ আক্রমণের প্রধান লক্ষ্যবস্তু। ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের মতে, সর্বাধিক ক্ষয়ক্ষতি নিশ্চিত করতেই অত্যন্ত জটিল কৌশলে এবং নিখুঁত পরিকল্পনা করে এই যৌথ হামলা চালানো হয়েছে। শান্তি আলোচনার সাম্প্রতিক কূটনৈতিক উদ্যোগের ঠিক পরেই মস্কোর এই বড়সড় আক্রমণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।
কীভাবে হলো এই যৌথ হামলা?
রুশ বাহিনী এই হামলায় একযোগে একাধিক মারণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে ছিল ওনিক্স (Oniks) অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্র, ইস্কান্দার-এম, এস-৪০০, কেএন-২৩ ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং খ-১০১ (Kh-101) ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। এছাড়া প্রায় ১৬৬টি শাহেদ-টাইপ অ্যাটাক ড্রোনের পাশাপাশি একাধিক ভুয়া বা ডিকয় (Decoy) ড্রোন মোতায়েন করা হয়েছিল, যার অর্ধেকেরও বেশি ছিল গতিশীল জেট-চালিত।
ইউক্রেনের বিমান বাহিনী, অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট মিসাইল ইউনিট, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম এবং মোবাইল ফায়ার গ্রুপ একযোগে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। যৌথ এই প্রচেষ্টায় মোট ১৭৫টি শূন্য লক্ষ্যবস্তু (১৪২টি ড্রোন, ৩১টি ক্রুজ এবং ২টি ব্যালাস্টিক বা অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্র) ভূপাতিত বা নিষ্ক্রিয় করা হয়। তবে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জোরালো প্রতিরোধ সত্ত্বেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সরাসরি আঘাতে দেশজুড়ে ২৯টি স্থান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আরও ৯টি স্থানে ধ্বংসাবশেষ এসে পড়েছে।
রাজধানী কিয়েভ ও অন্যান্য অঞ্চলের ক্ষয়ক্ষতি
কিয়েভ: রাজধানীতে ভয়াবহ হামলায় অন্তত ২ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ১০ জন আহত হয়েছেন। কিয়েভের অন্তত ৫টি ডিস্ট্রিক্ট ও ১৬টি এলাকায় বেসামরিক পরিকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও অগ্নিদগ্ধ হয়েছে। একাধিক আবাসিক ভবন, একটি স্কুল, গুদামঘর এবং বহু যানবাহন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ধসে পড়া আবাসনগুলোতে আটকে পড়া বহু মানুষকে জরুরি উদ্ধারকারী দল নিরাপদে উদ্ধার করেছে।
ওডেসা: ড্রোনের আঘাতে একটি সাধারণ বাজারে ভয়াবহ আগুন ধরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
খারকিভ: একটি বহুতল আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ২ জন আহত হয়েছেন।
সুমি অঞ্চল: কিয়েভ-সুমি রুটের একটি চলন্ত ট্রেনের ইঞ্জিনে রেল স্টেশনে থাকা অবস্থাতেই হামলা চালানো হয়। এছাড়া জাপোরিজিয়া ও দ্নিপ্রোপেত্রোভস্ক সহ অন্যান্য অঞ্চলেও গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো ধ্বংস হয়েছে।
কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট ও পোল্যান্ডের পদক্ষেপ
সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফ শান্তি আলোচনার নতুন উদ্যোগ নিয়ে কিয়েভ সফর করেছিলেন। তাঁদের সফরের সময় তিন দিন হামলা স্থগিত রাখা হলেও, এই ভয়াবহ আক্রমণের মাধ্যমে সেই সাময়িক বিরতির সম্পূর্ণ অবসান ঘটাল মস্কো। পুতিনের এই ধ্বংসাত্মক হামলার প্রভাব সীমান্ত ছাড়িয়ে প্রতিবেশী পোল্যান্ডেও গিয়ে পড়ে। নিজ দেশের আকাশসীমা সুরক্ষায় জরুরিভিত্তিতে সামরিক যুদ্ধবিমান মোতায়েন করতে বাধ্য হয় পোল্যান্ড।
কী বললেন ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট?
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, আধুনিক ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলি প্রতিহত করা এখনও তাঁদের দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মিত্র দেশগুলোর কাছে জরুরি ভিত্তিতে আরও বেশি করে ইন্টারসেপ্টর মিসাইল সরবরাহের জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। হামলার পর থেকেই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার ও আগুন নেভানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা।