‘নিজের দেশেই কাজ করতে ভয় লাগে!’ পাকিস্তান ক্রিকেটের অন্দরের কোন অন্ধকার সত্যি ফাঁস করলেন প্রাক্তন অধিনায়ক?

পাকিস্তান ক্রিকেটের অন্দরমহলে চলা বৈষম্য এবং হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে এবার এক বিস্ফোরক অভিযোগ তুললেন দেশের প্রাক্তন টেস্ট অধিনায়ক তথা সদ্য জাতীয় নির্বাচকের পদ থেকে সরে দাঁড়ানো মিসবা উল হক। একটি প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে বিস্ফোরক মন্তব্য করে তিনি দাবি করেছেন, পাকিস্তান ক্রিকেটে বিদেশি এবং স্থানীয় কোচদের সঙ্গে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়। বিদেশি কোচদের তুলনায় দেশীয় কোচদের অনেক বেশি সমালোচনা এবং কঠোর নজরদারির মুখে পড়তে হয় বলে অভিযোগ তাঁর।

বিদেশি বনাম দেশীয় কোচ বিতর্ক

যদিও বিদেশি কোচ নিয়োগের কোনো বিরোধিতা করেননি এই প্রাক্তন পাক তারকা। তবে তাঁর সাফ কথা, পাকিস্তানের সমর্থক, ক্রিকেট সমালোচক, সংবাদমাধ্যম এবং স্বয়ং ক্রিকেট বোর্ডেরও বিদেশি কোচদের প্রতি এক অন্ধ পক্ষপাতিত্ব রয়েছে। বিদেশি কোচদের অনেক বেশি ক্ষমতা এবং কর্তৃত্ব দেওয়া হয় এবং দল খারাপ ফল করলেও তাঁদের তুলনামূলকভাবে কম জবাবদিহি করতে হয়। এর ঠিক উলটো ছবি দেখা যায় স্থানীয় কোচদের ক্ষেত্রে, যাঁদের সমস্ত ব্যর্থতার দায় ঘাড়ের ওপর চাপিয়ে অবিরাম সমালোচনা সহ্য করতে হয়। দেশীয় কোচদের আরও বেশি সুরক্ষা ও সমর্থন দেওয়ার জোরালো দাবি জানিয়েছেন মিসবা। একইসঙ্গে তিনি যোগ করেন, দল খারাপ খেললেই ক্রিকেটারদের মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়া এবং গণমাধ্যমে লাগাতার সমালোচনা করার যে সংস্কৃতি পাকিস্তান ক্রিকেটে তৈরি হয়েছে, তা তরুণ খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস একেবারে চুরমার করে দিচ্ছে।

ইংল্যান্ড সিরিজের ব্যর্থতা ও হঠকারী সিদ্ধান্ত

हालেই ইংল্যান্ড সফরে পাকিস্তানের হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পরই দেশের ক্রিকেটে চরম বিতর্ক শুরু হয়। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ১৯৪ রানে বিশাল ব্যবধানে হেরে টেস্ট সিরিজে ০-২ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ হওয়ার পরই নড়েচড়ে বসে বোর্ড। সিরিজের তৃতীয় তথা শেষ টেস্টের আগেই দলে এক ধাক্কায় সাতটি বড় পরিবর্তন আনা হয়। এমনকি প্রধান কোচ ও বোলিং কোচকেও মাঝপথে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। নির্বাচকদের কাছে ইমাম উল হক এবং মহম্মদ রিজওয়ানের মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের দলে নেওয়ার মাপকাঠি নিয়ে জবাব তলব করা হয়। এই প্রসঙ্গে মিসবা মনে করেন, পাকিস্তান ক্রিকেটে দুর্ভাগ্যজনকভাবে ঠান্ডা মাথায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করার পরিবর্তে সবসময় হঠকারী ও প্রতিক্রিয়াশীল সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা কাজ করে। চাপের মুখে হঠাৎ করে ‘কসমেটিক সার্জারি’ করার মতো সিদ্ধান্তের কোনো সুফল মেলে না।

ভারতীয় ক্রিকেটের সফল মডেলের উদাহরণ

পাক ক্রিকেটের উন্নতির জন্য ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের কার্যপদ্ধতি অনুসরণ করার পরামর্শ দিয়েছেন মিসবা। রোহিত শর্মা এবং বিরাট কোহলির মতো সিনিয়র তারকাদের দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাক করার উদাহরণ টেনে তিনি জানান, ভারত কখনও হঠাৎ করে আতঙ্কিত হয়ে নিজেদের রুটিন বা পরিকল্পনা থেকে সরে দাঁড়ায়নি বলেই আজ বিশ্ব ক্রিকেটে রাজত্ব করছে। ভারতীয় ক্রিকেটে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। অথচ বর্তমান পাকিস্তানের তরুণ ক্রিকেটাররা ঘরোয়া ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটের চেয়ে অতিরিক্ত সাদা বলের ক্রিকেট বা টি-টোয়েন্টি লিগেই বেশি ব্যস্ত থাকছেন, যার ফলে লাল বলের ক্রিকেটে তাঁদের টেকনিক্যাল ভিত নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে এবং কঠিন পরিস্থিতিতে তাঁরা দ্রুত ভেঙে পড়ছেন। নয়ের দশকের পর থেকে ভারত যেভাবে নিজেদের ক্রিকেট কাঠামো ও পাইপলাইনে বিনিয়োগ করেছে, পাকিস্তানের ক্রিকেটেও সাফল্যের জন্য ঠিক সেই রকম ধৈর্য, ধারাবাহিক বিনিয়োগ এবং সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অত্যন্ত প্রয়োজন রয়েছে বলেই মনে করেন মিসবা উল হক।

Saheli Saha
  • Saheli Saha

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *