মানুষের মতো এবার জমিরও আসবে নিজস্ব ‘আধার কার্ড’! ১২ সংখ্যার নম্বর জানলেই মিলবে প্লটের সমস্ত তথ্য

সাধারণ মানুষের আধার কার্ডের ধাঁচেই এবার রাজ্যের প্রতিটি জমির প্লটের জন্য চালু হতে চলেছে ১২ সংখ্যার একটি সুনির্দিষ্ট ‘ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন নম্বর’। সরকারি নথিতে এই নতুন ব্যবস্থার পোশাকি নাম ‘ইউনিফায়েড ল্যান্ড পার্সেল আইডেন্টিফিকেশন নম্বর’ দেওয়া হলেও, প্রশাসনিক মহলে এটি ইতিমধ্যেই ‘জমির আধার’ নামেই পরিচিতি লাভ করেছে। মূলত জমি সংক্রান্ত ক্রমবর্ধমান জালিয়াতি, ভুয়ো দলিল তৈরি এবং দীর্ঘদিনের সীমানা সংক্রান্ত বিবাদ চিরতরে মিটিয়ে দিতেই রাজ্য প্রশাসনের এই অভিনব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রশাসন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যের প্রায় ৪২ হাজার মৌজায় কৃষি এবং অকৃষি জমি মিলিয়ে মোট প্লটের সংখ্যা ৫ কোটি ৯০ লক্ষ থেকে ৬ কোটি ৩ লক্ষের মধ্যে রয়েছে। এত বিপুল সংখ্যক জমির প্রতিটি প্লটকে সম্পূর্ণ আলাদা ও স্বতন্ত্র পরিচয় দিতেই এই ১২ সংখ্যার নির্দিষ্ট নম্বরটি ব্যবহার করা হবে। প্রশাসনের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক জানিয়েছেন, খুব শীঘ্রই এই বিশেষ ‘আধার’ প্রদান করার কাজ রাজ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হবে। এর ফলে প্রতিটি প্লট তার নিজস্ব পরিচয় পাওয়ার পাশাপাশি জালিয়াতি ও সীমানা বিবাদের মতো সমস্যাগুলি থেকে মুক্তি পাবে।
কীভাবে তৈরি হবে এই ইউনিক নম্বর?
এই বিশেষ নম্বর ব্যবস্থা চালু করার জন্য প্রতিটি মৌজার ম্যাপ জিও-ডিজিটাইজ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সেই লক্ষ্যেই পুরনো মৌজা ম্যাপ খতিয়ে দেখে প্রতিটি জমির বর্তমান অবস্থা সরেজমিনে যাচাই করা হচ্ছে। সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে পুরনো মানচিত্র সংশোধন করে যাবতীয় ডেটা ডিজিটাইজ করে সরকারি পোর্টালে আপলোড করা হবে। অক্ষাংশ এবং দ্রাঘিমাংশ নিখুঁতভাবে মেপে প্রতিটি প্লট নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করতে ইতিমধ্যেই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি কিনেছে রাজ্য সরকার। সেই আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যেই প্রতিটি জমির নিজস্ব ১২ সংখ্যার নম্বরটি সুনির্দিষ্টভাবে ধার্য করা হবে।
প্রাথমিকভাবে পাইলট প্রোজেক্ট হিসেবে হাওড়া জেলা থেকে এই বড় কর্মযজ্ঞের কাজ শুরুও হয়ে গিয়েছে। এর আগে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দফতর মৌজা ম্যাপ তৈরি করলেও তাতে কিছু প্রযুক্তিগত ত্রুটি থেকে গিয়েছিল, যে কারণে এবার নতুন করে একেবারে নিখুঁতভাবে ডিজিটাইজেশনের কাজে হাত দিয়েছে প্রশাসন।
মালিকদের হাতে আসবে বিশেষ কার্ড
এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফলভাবে সমাপ্ত হলে আগামী দিনে জমির মালিকদের হাতে একটি করে সুনির্দিষ্ট ‘ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন কার্ড’ তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে রাজ্য সরকারের। দেখতে অবিকল সাধারণ আধার কার্ডের মতোই এই বিশেষ কার্ডটিতে সংশ্লিষ্ট প্লটের নির্দিষ্ট ১২ সংখ্যার নম্বরটি খোদাই করা থাকবে। সরকারি পোর্টালে ওই ১২ সংখ্যার নম্বরটি এন্ট্রি করলেই এক ক্লিকে জমির যাবতীয় ‘ঠিকুজি-কুষ্ঠি’ কম্পিউটার বা মোবাইলের স্ক্রিনে ভেসে উঠবে। জমির আসল চরিত্র, বর্তমান মালিকের নাম, মৌজা, খতিয়ান কিংবা দাগ নম্বর—সবকিছুই মুহূর্তের মধ্যে যাচাই করা সম্ভব হবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, আগামী দিনে রাজ্যের যে কোনো নতুন জমি বা বাড়ি রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রেও দলিলের মধ্যে এই বিশেষ নম্বর উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক করা হতে চলেছে।
প্রশাসনিক মহলের দৃঢ় বিশ্বাস, নতুন এই ব্যবস্থা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের হয়রানি বহুগুণ কমে যাবে, তেমনই সরকারি কাজের গতিও বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। যে কোনো প্লটের একটি মাত্র ইউনিক নম্বর থাকলে জাল দলিল বানিয়ে জমি দখলের জালিয়াতি রোখা সহজ হবে। এছাড়া সব ক্ষেত্রে মৌজা, দাগ বা খতিয়ানের মতো জটিল তথ্য আলাদা করে মনে রাখার প্রয়োজন পড়বে না; কেবল একটি নির্দিষ্ট নম্বর বললেই সংশ্লিষ্ট মৌজার কোন জমির কথা বলা হচ্ছে তা একেবারে স্পষ্ট হয়ে যাবে। বিশেষ করে রাজ্যে শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের জমি সংক্রান্ত জটিলতা ও আইনি মারপ্যাঁচ নিমেষে কাটাতে এই নতুন ব্যবস্থা এক বিরাট ‘গেমচেঞ্জার’ হতে চলেছে বলেই আশা প্রকাশ করছে ওয়াকিবহাল মহল।