অন্নপূর্ণা যোজনার ফর্ম ফিলাপ করতেই কেলেঙ্কারি! স্ত্রীর বদলে স্বামীর অ্যাকাউন্টে নাম উঠতেই বর্ধমানে শোরগোল

অন্নপূর্ণা যোজনা প্রকল্পের সুবিধা পাওয়া এবং টাকা ঢোকা নিয়ে এবার নতুন করে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে বর্ধমান শহরে। এক মহিলা উপভোক্তার জমা দেওয়া আবেদনে তাঁর নিজের নামের পরিবর্তে হঠাত্‍ করেই স্বামীর নাম উঠে যাওয়ার ഗുരുত্বপূর্ণ অভিযোগ সামনে এসেছে। শুধু তাই নয়, সরকারি পোর্টালে টাকা সফলভাবে ক্রেডিট হওয়ার তথ্য দেখানো হলেও, সংশ্লিষ্ট পরিবারের সাফ দাবি যে তাঁদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে আদতে কোনো টাকাই পৌঁছয়নি। এমনকি একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নামে টাকা পাঠানো হয়েছে বলে সরকারি নথিতে দাবি করা হলেও, বাস্তবে কোনো অর্থ হাতে পাওয়ার উপযুক্ত প্রমাণ মিলছে না বলেই অভিযোগ করেছে ওই পরিবার।

বর্ধমান শহরের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের বিসি রোডের বাসিন্দা সীমা বিবি এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য সঠিকভাবে আবেদন করার পর প্রথম মাসের টাকা তিনি নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টেই পেয়েছিলেন। কিন্তু এর ঠিক পরপরই দু’মাস কোনো টাকা না আসায় তিনি বিষয়টি নিয়ে খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেন। গত সোমবার বর্ধমান পুরসভায় গিয়ে সমস্ত নথিপত্র পরীক্ষা করাতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন যে, সরকারি পোর্টালে আসল সুবিধাভোগীর নামের জায়গায় তাঁর বদলে তাঁর স্বামী শেখ রমজানের নাম নথিভুক্ত করা রয়েছে।

সীমা বিবির দাবি অনুযায়ী, আবেদনপত্রটি তিনি নিজে হাতে করেননি, বরং স্থানীয় একটি সাইবার ক্যাফের মাধ্যমে সেই ফর্ম পূরণ করানো হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি নিয়ে সেই ক্যাফেতে যোগাযোগ করা হলে কর্মীরা নিজেদের ভুলের কথা স্বীকার করেছেন বলেও তাঁর দাবি। ফলে সরকারি এই জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের আবেদনে এই ধরনের রদবদল কীভাবে হলো, তা নিয়ে এখন বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে।

এ বিষয়ে সীমা বিবি জানিয়েছেন, “আমার এখানে কোনো ভুল ছিল না। সাইবার ক্যাফে থেকেই ফর্ম পূরণ করা হয়েছিল। পরে জানতে পারি সেখানে বড় ধরনের ভুল হয়েছে। আমরা অত্যন্ত গরিব মানুষ, স্বামী টোটো চালিয়ে সংসার চালান। তাই সরকারি প্রকল্পের এই টাকা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমরা প্রচণ্ড সমস্যায় পড়েছি।”

অন্যদিকে, সরকারি টাকা আদৌ কোথায় গেল তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সীমার স্বামী শেখ রমজানও। তাঁর দাবি, পুরসভার তরফে জানানো হয়েছে যে তাঁর ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে তিন হাজার টাকা জমা পড়েছে। কিন্তু তিনি নিজেই সশরীরে ব্যাংকে গিয়ে পাসবই এবং অ্যাকাউন্টের সমস্ত তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করিয়েছেন। তাঁর সাফ কথা, সেখানে ওই টাকা জমা পড়ার বিন্দুমাত্র কোনো চিহ্ন নেই।

শেখ রমজান ক্ষোভের সুরে বলেন, “আমার নামে তিন হাজার টাকা ঢুকেছে বলে সরকারিভাবে জানানো হচ্ছে। কিন্তু আমি নিজে ব্যাংকে গিয়ে পাসবই আপডেট করিয়েছি, অ্যাকাউন্ট চেক করেছি। কোনো টাকাই ঢোকেনি। শুধু আমার নয়, আমার দুই ছেলের নামেও নাকি টাকা ঢুকেছে বলা হচ্ছে। অথচ বাস্তবে তাদের অ্যাকাউন্টেও কোনো টাকা আসেনি।”

এখানেই শেষ নয়, ওই পরিবারের আরও অভিযোগ, টাকা জমা পড়েছে বলে দাবি করার পাশাপাশি তাঁদের হেনস্তা করা হচ্ছে এবং নানা ধরনের কথা শোনানো হচ্ছে। এমনকি সীমা বিবিকে থানায় ও পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ তুলেছেন শেখ রমজান। নিজেদের দাবির সত্যতা প্রমাণ করতে তাঁরা যেকোনো মুহূর্তে ব্যাংকের স্টেটমেন্ট দেখাতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন। একজন মহিলা আবেদনকারীর নাম পরিবর্তিত হয়ে কীভাবে হঠাত্‍ করে তাঁর স্বামীর নাম সরকারি পোর্টালে যুক্ত হলো এবং সেই পুরো প্রক্রিয়াটি কীভাবে সম্পন্ন হলো, তা এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ইতিমধ্যেই পুরো ঘটনাটি নিয়ে পুরসভার তরফে উচ্চপর্যায়ে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জানা গিয়েছে, পুরসভার প্রতিনিধি তথা রাজ্যের প্রতিমন্ত্রী মৌমিতা বিশ্বাস মিশ্রের নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। একই সঙ্গে যদি ভুলভাবে কোনো অর্থ পাঠানো হয়ে থাকে, তবে তা সরকারি ফান্ডে ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে বলে খবর। তবে আবেদনপত্রে নাম পরিবর্তন করল কে, এবং সরকারি পোর্টালে টাকা পাঠানোর তথ্য তৈরি হওয়া সত্ত্বেও তা আসল ব্যাংকে কেন প্রতিফলিত হলো না—সেই প্রশ্নগুলির সঠিক উত্তর এখনও অধরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *