সৌন্দর্যের আড়ালে মৃত্যুর হাতছানি! নেপালের এই অভিশপ্ত শৃঙ্গে লুকিয়ে কোন ভয়ংকর রহস্য?

পাহাড়ের কি নিজস্ব কোনো জিঘাংসা থাকে? নাকি রূপকথার গল্পের সেই নিষ্ঠুর দৈত্যদের মতো সে-ও রক্ত আর ধ্বংসের গন্ধ ভালোবাসে? কাঠমান্ডুর ব্যস্ত শহর ছাড়িয়ে মাত্র ৪৫ কিলোমিটার উত্তরে গেলে মাথা তুলে দাঁড়ানো ৭,২৪৫ মিটারের লাংটাং লিরুং শৃঙ্গটি পর্যটকদের হাতছানি দেয়। অথচ সেই মায়াবী সাদা চাদরের আড়ালেই যুগ যুগ ধরে ওত পেতে বসে আছে এক নির্মম জল্লাদ।

২০১৫ সালের সেই প্রলয়ঙ্করী মুহূর্ত: গল্পের প্রথম নির্মম অধ্যায় শুরু হয়েছিল ২০১৫ সালের ২৫ এপ্রিল। ঠিক বেলা ১১টা ৫৬ মিনিটে ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্পের তীব্র ঝাঁকুনিতে লাংটাং লিরুংয়ের দক্ষিণ ঢালে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জমে থাকা বরফের সাম্রাজ্য ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। পাহাড়ের ৩,০০০ মিটার ওপর থেকে খসে পড়ে এক দানবীয় তুষারধস। মাত্র ৬৭ সেকেন্ডের মধ্যে বরফ, মাটি আর ভারী পাথরের আক্রোশে রূপকথার মতো সাজানো পুরো লাংটাং গ্রামটা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। তিনশোরও বেশি তাজা প্রাণ সেই বরফের কবরে চিরতরে ঘুমিয়ে পড়ে।

২০২৬ সালের নতুন বিপর্যয়: মানুষ ভেবেছিল প্রকৃতি বোধহয় শান্ত হয়েছে। কিন্তু ঠিক এগারো বছর পর, ২০২৬ সালের ২৬ অগস্ট সকালে লাংটাং লিরুংয়ের উত্তর ঢালে শুরু হয় দ্বিতীয় নিষ্ঠুর খেলা। প্রায় ৫,২০০ মিটার উঁচুতে থাকা একটি আস্ত হিমবাহ ও তার নিচের পাথুরে কঙ্কাল ভেঙে গুঁড়িয়ে যায়। প্রায় ২,০০০ মিটার নিচে লেন্দে নদীর বুকে সেই ধস আছড়ে পড়লে ৫.২ মাত্রার ভূকম্পন তৈরি হয়। নদীর স্বাভাবিক গতিপথ আটকে তৈরি হওয়া কৃত্রিম বাঁধ ভেঙে জলরাশি গ্রাস করে নেয় সবকিছু। মাত্র আধ ঘণ্টার মধ্যে নদীর জলস্তর সাত থেকে নয় মিটার উঠে গিয়ে লেন্দে থেকে ভোটকোশি ও ত্রিশূলি নদী হয়ে টানা ১০০ কিলোমিটার পথ জুড়ে বাড়িঘর, সেতু ও শত শত মানুষকে খড়কুটোর মতো ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

কেন এই রক্তপিপাসা? ভূবিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, এই রূপসী শৃঙ্গের অন্তরে চলছে তীব্র অন্তর্দ্বন্দ্ব। কোটি কোটি বছর ধরে ভূগর্ভস্থ টেকটোনিক প্লেটের ঠেলায় শৃঙ্গটি আরও উঁচুতে উঠছে এবং তার ঢাল খাড়া ও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাব। উষ্ণতার জেরে বরফ গলে পাহাড়ের ভিত আলগা হয়ে ধস নামছে। বরফের শুভ্র চাদর মুড়ি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লাংটাং লিরুং আজ তাই প্রকৃতির চরম প্রতিশোধের এক রক্তিম দলিল হয়ে উঠেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *