মহাদেবের গলায় থাকা ওই সাপ কি নিছকই অলঙ্কার? বাসুকি নাগকে নিয়ে লুকিয়ে রয়েছে কোন রহস্যময় ও ভয়ানক ইতিহাস?

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে দেবাদিদেব মহাদেব এক অত্যন্ত রহস্যময় ও পূজনীয় শক্তি। শিব বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে হাতে ত্রিশূল, কপালে তৃতীয় নয়ন, সারা গায়ে ভস্ম এবং গলায় পেঁচিয়ে থাকা একটি সাপ। কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছেন কি, মহাদেবের গলায় ওই সাপটি কেন থাকে? এটি কেবল কোনো সাধারণ অলঙ্কার নয়, এর নেপথ্যে রয়েছে পুরাণ ও ইতিহাসের এক দীর্ঘ এবং আকর্ষণীয় কাহিনী।

সমুদ্র মন্থন ও হলাহল বিষের উপাখ্যান
পৌরাণিক কথা অনুযায়ী, অমরত্ব লাভের আশায় দেবতা ও অসুররা মিলে ক্ষীরসাগর বা সমুদ্র মন্থন করেছিলেন। সেই মন্থনকালে মন্দর পর্বতকে মন্থন দণ্ড এবং নাগরাজ বাসুকিকে দড়ি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। মন্থন প্রক্রিয়া চলাকালীন সমুদ্র থেকে মারাত্মক হলাহল বিষ উঠে আসে, যা গোটা সৃষ্টিকে ধ্বংস করার উপক্রম করেছিল। জগতের সুরক্ষায় সেই বিষ পান করে নীলকণ্ঠ হন মহাদেব। জনশ্রুতি রয়েছে, সেই বিষের তীব্র জ্বালা ও তেজ প্রশমিত করতেই নাগরাজ বাসুকিকে নিজের গলায় ধারণ করেছিলেন দেবাদিদেব।

বাসুকি কীভাবে পেলেন শিবের সান্নিধ্য?
সমুদ্র মন্থনের সময় দড়ি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় বাসুকির শরীর মারাত্মকভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে দেবাদিদেবের নৈকট্য লাভের জন্য কঠোর তপস্যা শুরু করেন নাগরাজ। তাঁর নিষ্ঠা ও ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে মহাদেব তাঁকে বর দেন যে তিনি সর্বদা তাঁর সঙ্গে থাকবেন এবং গলার অলঙ্কার হিসেবে স্থান দেবেন। সেই থেকেই বাসুকি শিবের চিরসঙ্গী।

আরেকটি প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, সর্পমাতা কদ্রু তাঁর নিজের সন্তানদের যজ্ঞের আগুনে ভস্ম হওয়ার অভিশাপ দিয়েছিলেন। সেই মর্মান্তিক অভিশাপ থেকে রক্ষা পেতে বাসুকি শেষ পর্যন্ত মহাদেবের শরণাপন্ন হন। দেবাদিদেব তাঁকে রক্ষা করে নিজের গলায় স্থান দেন, যার ফলে বাসুকির ওপর সেই অভিশাপের কোনো প্রভাব পড়েনি।

আধ্যাত্মিক তাৎপর্য ও কালচক্রের প্রতীক
শিবের গলার এই সাপ কেবল পৌরাণিক গল্পেই সীমাবদ্ধ নয়, এর নেপথ্যে রয়েছে গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য। সাপের খোলস ত্যাগ করা মূলত পুনর্জন্ম বা পরিবর্তনের প্রতীক। এছাড়া সাপের শরীরের তিনটি প্যাঁচ অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতকে নির্দেশ করে, যা দেবাদিদেবের হাতের মুঠোয় থাকা মহাশক্তির কালচক্রকে বোঝায়। এটি মানব শরীরের সুপ্ত কুণ্ডলিনী শক্তিরও প্রতীক।

সাপ সাধারণত ভয়, বিষ এবং মৃত্যুর প্রতিমূর্তি। কিন্তু মহাদেব এই অত্যন্ত ভয়ের ও মারাত্মক প্রাণীটিকে নিজের গলায় ধারণ করে গোটা বিশ্বকে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে তিনি ভয় ও মৃত্যুর সম্পূর্ণ ঊর্ধ্বে। ‘পশুপতিনাথ’ হিসেবে তিনি সমস্ত জীবের প্রতি সমান করুণা ও ভালোবাসার বার্তা দেন। ফলে মহাদেবের গলার এই সাপ শুধুই একটি অলঙ্কার নয়, বরং এটি তাঁর অসীম শক্তি, নিয়ন্ত্রণ এবং নির্ভীকতার এক অনুপম প্রতীক।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *