ভয়ংকর বিপদে নীলগিরি! জলের খরা আর খামখেয়ালি আবহাওয়ায় চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে শতাব্দীপ্রাচীন জঙ্গল?

নীলগিরির আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা এবং লাগাতার বাড়তে থাকা তাপমাত্রা শুধু তীব্র জলসংকটই তৈরি করছে না, সেখানকার গোটা বনভূমির প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রকেই চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সম্প্রতি ‘রিমোট সেন্সিং’ নামক আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণায় এমনটাই চাঞ্চল্যকর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিজ্ঞানীরা। প্রায় দুই দশকের স্যাটেলাইট ডেটা বিশ্লেষণ করে এই পরিবর্তনের ছবি সামনে আনা হয়েছে।

দু’দশকের স্যাটেলাইট তথ্যে উদ্বেগজনক চিত্র
‘ম্যাপিং ফরেস্ট ফেনোলজিক্যাল শিফট ইন নীলগিরি বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ, ওয়েস্টার্ন ঘাটস: রেসপন্স টু ক্লাইমেট চেঞ্জ’ শীর্ষক ওই গবেষণাপত্রটিতে ২০০০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২০ বছরের তথ্য খতিয়ে দেখা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৫০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে নীলগিরি অঞ্চলে প্রতি বছর নিয়মিতভাবে ০.০১ ডিগ্রি সেলসিয়াস করে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি, পাল্লা দিয়ে প্রতি বছর গড়ে ৩.৯৭ মিলিমিটার করে কমেছে বৃষ্টিপাতও। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে আর্দ্র পর্ণমোচী, শুষ্ক পর্ণমোচী, আধা-চিরসবুজ এবং চিরসবুজ—এই চার প্রধান অরণ্যের ওপর।

গবেষকরা স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের বদল বুঝতে ঋতুর শুরু এবং শেষের সময়টাকে ম্যাপ করেছেন। দেখা গেছে, প্রথম দশকে (২০০১-২০১০) ঋতু শুরু হতে দেরি হলেও, পরবর্তী দশকে (২০১১-২০২০) সেই চেনা ছক সম্পূর্ণ উল্টে গেছে। এখন প্রায় সব জঙ্গলেই ঋতু নির্ধারিত সময়ের অনেক আগে শুরু হয়ে যাচ্ছে এবং ঋতুকালের সময়সীমায় ব্যাপক হেরফের ঘটছে।

শুকিয়ে যাচ্ছে শোলা জঙ্গল, সময়ের আগে ফুটছে ফুল
আপস্ট্রিম ইকোলজি-র প্রতিষ্ঠাতা তথা বিশিষ্ট পরিবেশবিদ গডউইন বসন্ত বস্কো জানিয়েছেন, নীলগিরির বিখ্যাত শোলা অরণ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের এই বিরূপ প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। শেওলা, ফার্ন কিংবা অর্কিডের মতো দুর্লভ উদ্ভিদগুলো আগের তুলনায় অনেক বেশি শুষ্ক ঠেকছে এবং জঙ্গল জুড়ে এক অদ্ভুত হলদেটে ভাব দেখা যাচ্ছে। অথচ এই জঙ্গলগুলোর বৈশিষ্ট্যই ছিল নিজস্ব ঠান্ডা ও স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়া ধরে রাখা।

পাশাপাশি প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম বদলানোর ফলে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই গাছে ফুল চলে আসছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ম্যাগনোলিয়া নিলাগাইরিকা গাছে বর্ষার পর ফুল ফোটার কথা থাকলেও এখন জুনের শুরুতেই ফুল ফুটে যাচ্ছে। এছাড়া স্থানীয় বিভিন্ন তৃণভূমির গাছেও ফুল আসার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

বড় বিপদের মুখে বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য
বিজ্ঞানীদের মতে, উদ্ভিদ এবং তাদের পরাগরেণু বাহক বা বীজ ছড়ানোর দায়িত্বে থাকা প্রাণীদের জীবনচক্রের সময়ের সঙ্গে মিল না থাকলে গোটা বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়তে পারে। যদি নির্দিষ্ট সময়ের আগেই ফুল ফুটে যায়, তবে গাছ সঠিক পরাগমিলনের সুযোগ হারায়। এর জেরে নতুন গাছ জন্মানোর হার মারাত্মকভাবে কমে যায়, কারণ সঠিক সময়ে যথেষ্ট পরিমাণ বীজ তৈরি ও তা ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয় না।

গবেষণাটি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে জলবায়ু পরিবর্তন কেবল জঙ্গলকে কম সবুজ করে তুলছে না, বরং এটি বন্যপ্রাথমিক উদ্ভিদ ও প্রাণীর পুরো জীবনচক্রের চাকাটাই ওলটপালট করে দিচ্ছে। এই ক্রমবর্ধমান পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় দ্রুত সুনির্দিষ্ট এবং কঠোর সংরক্ষণ নীতি গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন গবেষকরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *