খাবারের প্যাকেটে বিষের লাল দাগ! কেন্দ্রকে ২ সপ্তাহের চরম আলটিমেটাম সুপ্রিম কোর্টের

প্যাকেটবন্দি বা প্রক্রিয়াজাত খাবারের মোড়কের গায়ে স্পষ্ট অক্ষরে ও ছবির মাধ্যমে বাধ্যতামূলক সতর্কবার্তা চালু করা নিয়ে এবার কেন্দ্রকে তীব্র ভর্ৎসনা করল সুপ্রিম কোর্ট। দেশের ক্রমবর্ধমান স্থূলতা ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় সরকারের ঢিলেঢালা মনোভাব এবং অনিচ্ছাকে কড়া ভাষায় সমালোচনা করে শীর্ষ আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, কোনও অবস্থাতেই দেশের জনস্বাস্থ্য ও মানুষের জীবন নিয়ে আপস বরদাস্ত করা হবে না। এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য কেন্দ্রকে মাত্র দুই সপ্তাহের কড়া আলটিমেটাম দিয়েছে আদালত।
কেন্দ্রের যুক্তিতে ক্ষুব্ধ শীর্ষ আদালত
বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কে বিনোদ চন্দ্রনের ডিভিশন বেঞ্চে এই মামলার শুনানি চলাকালীন কেন্দ্রের তরফে সওয়াল করা হয় যে, উন্নত দেশগুলির খাদ্য লেবেলিংয়ের মানদণ্ড ভারতের ক্ষেত্রে সরাসরি কার্যকর করা কঠিন। এই যুক্তিতে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে বিচারপতি পারদিওয়ালা পাল্টা প্রশ্ন তোলেন, “তাহলে কি ভারতের উচিত চিরকাল একটি অনুন্নত দেশ হিসেবেই রয়ে গেয়ে যাওয়া?” আদালত সাফ জানিয়ে দিয়েছে, সরকার যদি নিজে থেকে দ্রুত কোনো কার্যকর নীতি প্রণয়ন না করে, তবে বাধ্য হয়ে সুপ্রিম কোর্ট নিজেই বিচার বিভাগীয় ক্ষমতা প্রয়োগ করে কঠোর নির্দেশ জারি করবে।
সামনে এল উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান
‘৩এস অ্যান্ড আওয়ার হেলথ সোসাইটি’ নামক একটি অলাভজনক সংস্থার দায়ের করা জনস্বার্থ মামলার প্রেক্ষিতে এই নজরকাড়া আইনি পদক্ষেপ সামনে এসেছে। আবেদনে দাবি করা হয়েছে, চিপস, বিস্কুট বা কোল্ড ড্রিঙ্কসের মতো অতিরিক্ত নুন, চিনি ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটযুক্ত প্যাকেজড খাবারে মোড়কের উল্টো পিঠে ছোট অক্ষরে পুষ্টিগুণ লেখার বদলে একেবারে সামনের অংশে বড় আকারে লাল রঙের সতর্কতা চিহ্ন বা ‘ফ্রন্ট-অফ-প্যাক ওয়ার্নিং লেবেল’ দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হোক।
আদালত সম্প্রতি প্রকাশিত ‘অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫-২৬’ এবং জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষার তথ্য তুলে ধরে জানিয়েছে, দেশে ওবেসিটি বা স্থূলতা এখন অন্যতম বড় স্বাস্থ্য সংকট। ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ভারতে অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের বাজার ১৫০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এর জেরে সাধারণ মানুষের ঐতিহ্যবাহী পুষ্টিকর খাবার হারিয়ে যাচ্ছে এবং ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের মতো মারণ রোগ ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে স্থূলতার মাত্রা যেভাবে বাড়ছে, তাতে উদ্বেগ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ
খাদ্য সুরক্ষা ও সঠিক পুষ্টির বিষয়টিকে ভারতীয় সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত ‘জীবনের অধিকার’ ও ‘সুস্বাস্থ্যের অধিকার’-এর পরিধিভুক্ত বলে উল্লেখ করেছে সুপ্রিম কোর্ট। বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, ক্রেতারা বাজার থেকে কী কিনে খাচ্ছেন, সে বিষয়ে স্বচ্ছ ও সহজ তথ্য পাওয়ার পূর্ণ অধিকার নাগরিকদের রয়েছে। খাদ্য প্রস্তুতকারী বড় বড় সংস্থাগুলির বাণিজ্যিক ও আর্থিক লাভের চেয়ে দেশের কোটি কোটি মানুষের স্বাস্থ্য যে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সেই বার্তা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিল শীর্ষ আদালত। এখন দেখার, নির্ধারিত দুই সপ্তাহের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকার ঠিক কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে।