ত্রিশেই কি ডেকে আনছেন হৃদ্রোগের বিপদ? নিজের অজান্তে রক্তে জমছে কোন বিষাক্ত কোলেস্টেরল?

নিজের বয়স তিরিশের কোঠায় হলে শরীর সুস্থ থাকা এবং কোনো শারীরিক উপসর্গ না থাকাকেই স্বাভাবিক বলে মনে করেন অনেকে। ভাবেন, কোলেস্টেরল বা হৃদ্রোগের কথা চিন্তা করার জন্য এখনও প্রচুর সময় পড়ে রয়েছে। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, কম বয়সে রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল বা এলডিএল (LDL)-এর মাত্রা বৃদ্ধি ভবিষ্যতে হৃদ্রোগের এক সুদূরপ্রসারী ও মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই শুধু ‘বয়স কম’ এই যুক্তিতে বিষয়টিকে অবহেলা করা একেবারেই উচিত নয়।
ভুবনেশ্বরের মণিপাল হসপিটালের ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. দিব্য রঞ্জন বেহেরা এ বিষয়ে সতর্ক করে জানিয়েছেন, বয়স কম এবং আপনি শারীরিকভাবে সুস্থ বোধ করছেন বলেই রক্তে উচ্চ কোলেস্টেরলকে উড়িয়ে দেওয়া বোকামি হবে। আসল বিষয় হলো আপনার এলডিএল-এর মাত্রা ঠিক কত, সামগ্রিক ঝুঁকির মাত্রা কেমন এবং কত বছর ধরে আপনার ধমনিতে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল জমছে, তা বোঝা।
কেন এলডিএল কোলেস্টেরল বিপজ্জনক?
শরীরের কোষ গঠন এবং হরমোন তৈরির জন্য নির্দিষ্ট মাত্রায় কোলেস্টেরলের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু সমস্যা তৈরি করে লো-ডেনসিটি লিপোপ্রোটিন কোলেস্টেরল বা এলডিএল-সি, যাকে সাধারণভাবে ‘খারাপ’ কোলেস্টেরল বলা হয়।
দীর্ঘদিন ধরে রক্তে এলডিএল-এর মাত্রা বেশি থাকলে তা ধীরে ধীরে ধমনির দেওয়ালে প্লাক বা চর্বির আস্তরণ তৈরি করতে শুরু করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলা হয় এথেরোস্ক্লেরোসিস (Atherosclerosis)। এর ফলে ধমনি সংকুচিত হয়ে যায় এবং হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো, এই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ নীরবে ঘটে এবং এর কোনো স্পষ্ট প্রাথমিক উপসর্গ থাকে না।
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের (AHA) মতে, মধ্যবয়স আসার অনেক আগেই উচ্চ কোলেস্টেরল কার্ডিওভাসকুলার স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে শুরু করে। তাই জীবনের প্রথম দিক থেকেই এ বিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরি।
‘অপেক্ষা করো এবং দেখো’ নীতি কি সবসময় কাজ করে?
উচ্চ কোলেস্টেরল মানেই যে সবাইকে সঙ্গে সঙ্গে ওষুধ খেতে হবে, এমনটা নয়। চিকিৎসকরা রোগীর আসল এলডিএল মাত্রা, পারিবারিক ইতিহাস, ডায়াবিটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ধূমপান বা অন্যান্য ঝুঁকির বিষয়গুলো খতিয়ে দেখেন।
বিশেষ করে যদি রক্তে এলডিএল খুব বেশি থাকে অথবা পরিবারে অল্প বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাস থাকে, তবে সতর্ক হওয়া বাধ্যতামূলক। বংশগত কারণেও অনেক সময় খুব কম বয়স থেকে ফ্যামিলিয়াল হাইপারকোলেস্টেরোমিয়া (Familial Hypercholesterolaemia) হতে পারে। ডা. বেহেরা বলেন, “কম বয়সের কারণে হয়তো কারো আগামী ১০ বছরের ঝুঁকি কম মনে হতে পারে, তাই বলে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ এলডিএল-এর সংস্পর্শে থাকাকে অবহেলা করা যাবে না।”
জীবনযাত্রার পরিবর্তন কি যথেষ্ট?
অনেকের ক্ষেত্রেই খাদ্যাভ্যাস বদলানো এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তন কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ট্রান্স ফ্যাট বা স্যাচুরেটেড ফ্যাটযুক্ত খাবার কমানো, শাকসবজি, ফলমূল, হোল গ্রেইন এবং ফাইবারযুক্ত খাবার খাওয়া এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম খুবই জরুরি। প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি ধরনের শারীরিক ব্যায়ামের পরামর্শ দেওয়া হয়।
তবে সবার ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার পরিবর্তন দিয়ে কোলেস্টেরল পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে না। বিশেষ করে জিনগত বা বংশগত কারণ থাকলে খাদ্যাভ্যাসে আমূল পরিবর্তন আনার পরেও রক্তে এলডিএল উচ্চ মাত্রায় থেকে যেতে পারে।
ওষুধ খাওয়ার অর্থ কি হৃদযন্ত্র ইতিমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত?
অনেকেরই ধারণা, কোলেস্টেরলের ওষুধ খাওয়ার অর্থ বুঝি হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়া। চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। ভবিষ্যতে যাতে বড় ধরনের কার্ডিওভাসকুলার সমস্যা এড়ানো যায়, তার জন্যই নির্দিষ্ট কিছু মানুষকে কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এটি আসলে ধমনির ওপর থেকে অতিরিক্ত কোলেস্টেরলের চাপ কমানোর একটি প্রতিরোধমূলক কৌশল।
ডা. বেহেরা পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, “আপনার বয়স যদি ত্রিশের কোঠায় হয় এবং কোলেস্টেরল বেশি থাকে, তবে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে এটিকে উপেক্ষা করাও নিরাপদ নয়। রক্তে এলডিএল-এর মাত্রা আপনার দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যের জন্য কী ইঙ্গিত দিচ্ছে এবং আপনার পারিবারিক ইতিহাস এর সঙ্গে যুক্ত কি না, তা একজন চিকিৎসকের সঙ্গে বসে অবশ্যই আলোচনা করুন।”