পাহাড় কিংবা সমুদ্র সৈকতে এবার স্বপ্নের বিয়ে! বাংলার মাটিতেই ডেস্টিনেশন ওয়েডিংয়ের সুযোগ করতে বড় পদক্ষেপ সরকারের

বর্তমান তরুণ প্রজন্মের কাছে নিজেদের বিবাহবার্ষিকীকে চিরস্মরণীয় করে তুলতে ‘ডেস্টিনেশন ওয়েডিং’-এর ঝোঁক এখন আকাশছোঁয়া। রাজবাড়ি, জমিদারবাড়ি, ঐতিহাসিক দুর্গ কিংবা নীল সমুদ্রের বেলাভূমি—বিয়ে ও সংবর্ধনার আসর বসাতে এখন এমন অফবিট জায়গাই পছন্দ হবু দম্পতিদের। আর সেই ট্রেন্ডকে মাথায় রেখেই দেশের ও বিদেশের পর্যটকদের কাছে বাংলাকে একটি আকর্ষণীয় ‘ওয়েডিং ডেস্টিনেশন’ বা বিয়ের গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতে বড়সড় উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।
ডেস্টিনেশন ওয়েডিং নিয়ে সরকারের মাস্টারপ্ল্যান
পশ্চিমবঙ্গকে ওয়েডিং ট্যুরিজমের মানচিত্রে এক নম্বরে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই আসরে নেমেছে পর্যটন দফতর। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেশের প্রথম সারির একাধিক ওয়েডিং প্ল্যানারের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকও সেরে ফেলেছেন রাজ্যের পর্যটনমন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ। সেই বৈঠকে বাংলার প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য, সমৃদ্ধ ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য এবং মনোরম পর্যটনকেন্দ্রগুলিকে কীভাবে বিয়ের আকর্ষণীয় মণ্ডপ হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। পাহাড় থেকে শুরু করে সমুদ্র সৈকত, রাজপ্রাসাদ থেকে ঐতিহাসিক স্থাপনা—সবকিছুকেই এই পরিকল্পনার পোক্ত কাঠামোর আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়েছে নবান্ন।
এই প্রসঙ্গে পর্যটনমন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, “বাংলায় একদিকে যেমন বরফাবৃত পাহাড় রয়েছে, তেমনই অন্যদিকে রয়েছে বিশাল সমুদ্র সৈকত। এছাড়া আমাদের রাজ্যে ছড়িয়ে রয়েছে প্রচুর ঐতিহ্যমন্ডিত ভবন ও রাজপ্রাসাদ। ভবিষ্যতে দার্জিলিং, সুন্দরবন, পুরুলিয়া এবং দিঘার মতো নান্দনিক জায়গাগুলিকে এক্সক্লুসিভ ওয়েডিং ডেস্টিনেশন স্পট হিসেবে গড়ে তোলা হবে।” তবে শুধু বিয়ের অনুষ্ঠানই নয়, এর পাশাপাশি রাজ্যের সামগ্রিক পর্যটন ব্যবস্থাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাও সামনে এসেছে। আগের সরকারের আমলে পর্যটন দফতরের প্রচুর অর্থ বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও তা সঠিকভাবে কাজে লাগানো হয়নি বলে অভিযোগ তুলেছেন বর্তমান মন্ত্রী।
পরিষেবা বৃদ্ধি ও নতুন ট্যুরিস্ট হাব
পর্যটকদের যাতায়াত ও থাকা-খাওয়ার সুবিধা আরও উন্নত করতে রাজ্যজুড়ে এক ধাক্কায় ১,০০০টি নতুন ‘ট্যুরিস্ট অ্যামেনিটি সেন্টার’ তৈরি করা হবে। প্রতিটি জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে পর্যাপ্ত পানীয় জলের ব্যবস্থা এবং আধুনিক স্বাস্থ্যসম্মত বায়ো-টয়লেট তৈরির ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া পর্যটন দফতরের নিজস্ব রাজস্ব বাড়াতে বিকল্প উপায়ে আয়ের পথও প্রশস্ত করা হচ্ছে।
প্রতিটি জেলার নিজস্ব অনন্য পর্যটন আকর্ষণকে সামনে রেখে বিশেষ ‘ডিস্ট্রিক্ট ট্যুরিজম প্যাকেজ’ চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই জেলার একাধিক দর্শনীয় স্থানকে একসঙ্গে যুক্ত করে পর্যটকদের জন্য এই আকর্ষণীয় প্যাকেজ তৈরি করা হবে, যার ফলে স্থানীয় পর্যটন শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটবে। বছরের ৩৬৫ দিনই যাতে সমানভাবে পর্যটন মরশুম বজায় থাকে, তার জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করেছে দফতর। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের পর্যটন ও আতিথেয়তা শিল্পকে আরও বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যেতে শিলিগুড়িতে একটি আধুনিক ‘হোটেল ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউট’ গড়ে তোলার কথাও ঘোষণা করেছেন পর্যটনমন্ত্রী।
ওয়ান স্টেট, ওয়ান গ্লোবাল ডেস্টিনেশন ভাবনা
আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে বাংলাকে আরও শক্তিশালী ও উজ্জ্বল করে তুলতে ‘ওয়ান স্টেট, ওয়ান গ্লোবাল ডেস্টিনেশন’ (One State, One Global Destination) এই ভাবনাকে সামনে রেখেই এগোচ্ছে রাজ্য। পর্যটনমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই মহা-পরিকল্পনার প্রথম ধাপে দার্জিলিং এবং সুন্দরবনের পরিকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পাশাপাশি, দক্ষিণবঙ্গের সমুদ্র সৈকত দিঘা এবং মন্দারমণির মতো জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রগুলির মানও আন্তর্জাতিক স্তরে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে, বাংলার পর্যটন ও অর্থনীতির মুকুটে খুব শীঘ্রই এক নতুন ও উজ্জ্বল羽 যোগ হতে চলেছে।