দিল্লির অভিভাবকদের জন্য বিরাট স্বস্তির খবর! ট্রাফিকের ধোঁয়া কমলেই কি ঝড়ের গতিতে বাড়বে বাচ্চাদের ফুসফুসের ক্ষমতা?

শুধু ধোঁয়া কমানোই নয়, রাস্তার ধুলোবালি ও যানবাহনের দূষণ রোধ করতে পারলে তা শিশুদের ফুসফুস গঠনেও অভাবনীয় সাহায্য করতে পারে। ‘দ্য ল্যানসেট পাবলিক হেলথ’ (The Lancet Public Health)-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ভারতের মতো যেসব দেশের বড় শহরগুলোতে যানবাহনের ধোঁয়া ও খারাপ বায়ুমানের সমস্যা নিত্যদিনের, তাদের জন্য এই গবেষণাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে।
যুক্তরাজ্যের লন্ডন এবং লুটন শহরের শিশুদের ওপর এই গবেষণাটি চালানো হয়। লন্ডনে ‘আল্ট্রা লো এমিশন জোন’ (ULEZ) চালুর পর দেখা গেছে, সেখানকার শিশুদের ফুসফুসের কার্যকারিতা লুটনের শিশুদের তুলনায় দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। যেখানে লুটনে এই ধরনের কোনো ক্লিন-এয়ার জোন ছিল না। গবেষণায় দেখা যায়, মাত্র চার বছরের মধ্যে দুই শহরের শিশুদের ফুসফুসের ক্ষমতার ফারাক কার্যত ঘুচে গেছে।
লন্ডন ও লুটনের ৩ হাজার ৪১৪ জন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে নিয়ে এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়। গবেষকরা ৬ থেকে ৯ বছর বয়সি শিশুদের ওপর টানা পাঁচ বছর ধরে ফুসফুসের পরীক্ষা চালিয়ে তাদের স্বাস্থ্যের বিকাশ পর্যবেক্ষণ করেন। ২০১৯ সালের এপ্রিলে লন্ডন কর্তৃপক্ষ এমন যানবাহনগুলোর জন্য প্রতিদিনের চার্জ বা ফি বাধ্যতামূলক করে, যেগুলো নির্দিষ্ট নির্গমন মানদণ্ড পূরণ করে না। এর ফলে গবেষকরা বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই যাচাই করার সুযোগ পান যে, ট্রাফিকের দূষণ কমালে শিশুদের স্বাস্থ্যে কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়ে কিনা।
গবেষণায় দেখা গেছে, ইউএলইজেড (ULEZ) চালুর পর লন্ডনে দূষণের মাত্রা দ্রুত কমতে শুরু করায় শিশুদের ফুসফুসের বৃদ্ধির গতিও বেড়ে যায়। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ফুসফুসের কার্যকারিতার অন্যতম প্রধান মাপকাঠি হলো প্রতি সেকেন্ডে সর্বোচ্চ নিঃশ্বাস ছাড়ার পরিমাণ (FEV₁)। লন্ডনের শিশুদের ক্ষেত্রে এই মাপকাঠিটি লুটনের শিশুদের তুলনায় প্রতি বছর প্রায় ১০ মিলিলিটার বেশি হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। চার বছর পর দুই অঞ্চলের শিশুদের ফুসফুসের গড় ক্ষমতা প্রায় একই পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শৈশবে ফুসফুসের সঠিক বিকাশ পরবর্তীতে পুরো জীবনের শ্বাসকষ্ট জনিত স্বাস্থ্যকে সুরক্ষা দেয়। দীর্ঘদিন ধরেই খারাপ বায়ুমান ফুসফুসের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবে লন্ডনের এই গবেষণা প্রমাণ করে যে, দূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নিলে শিশুদের ফুসফুসের স্বাভাবিক বিকাশ দ্রুততর হতে পারে।
ভারতের মতো দেশের জন্য এই গবেষণার গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ এখানকার বড় শহরগুলোতে শিশুরা নিয়মিত যানবাহনের ধোঁয়া এবং অন্যান্য দূষণের শিকার হচ্ছে। অতীতে দিল্লির ওপর হওয়া বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, বায়ুমানের অবনতির কারণে শিশুদের মধ্যে শ্বাসকষ্টজনিত লক্ষণ ও ফুসফুসের দুর্বলতা দেখা দিচ্ছে। এছাড়া দূষিত শহুরে পরিবেশে বসবাসকারী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে হাঁপানি বা অ্যাজমার প্রকোপও বেশি।
ল্যানসেট প্ল্যানেটারি হেলথ-এর একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, ভারতে দীর্ঘমেয়াদি বায়ু দূষণের কারণে বার্ষিক প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়, যা জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরু এবং কলকাতার মতো জনবহুল শহরগুলোর জন্য লন্ডনের এই অভিজ্ঞতা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন সামনে এনেছে—যানবাহনের ধোঁয়া নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে কমাতে পারলে তা কি সত্যিই শিশুদের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাতে পারে?
ভারতের ক্ষেত্রে এই ফলাফল গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আরও পরিচ্ছন্ন করা, কঠোর নির্গমন মানদণ্ড চালু করা, বৈদ্যুতিক বাস ও ফ্লিটের ব্যবহার বাড়ানো এবং হাঁটা বা সাইকেল চালানোর পরিকাঠামো উন্নত করার দাবিকে আরও জোরালো করে তুলেছে। পাশাপাশি শিল্পকারখানার দূষণ ও ধুলোবালি নিয়ন্ত্রণেও পদক্ষেপ করা জরুরি।
অভিভাবকদের জন্য সবচেয়ে বড় বার্তাটি হলো—শিশুদের ফুসফুস এখনও বিকশিত হচ্ছে। আজ তারা যে বাতাসে শ্বাস নিচ্ছে, সেটাই তাদের আগামী দিনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেবে। লন্ডনের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, নির্মল বাতাস কেবল একটি পরিবেশগত লক্ষ্যমাত্রাই নয়, বরং তা আগামী প্রজন্মের সুস্থ জীবনের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।