বাংলায় কি তবে ফের বিধানসভা নির্বাচন? ভোটার তালিকা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের চাঞ্চল্যকর প্রশ্নে রাজনৈতিক মহলে হুলুস্থুল!

ভোটার তালিকা সংশোধন তথা বিশেষ নিবিড় পর্যালোচনা (SIR) প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া আইনি জট এবার সরাসরি দেশের সর্বোচ্চ আদালতে পৌঁছে গেল। মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টে এই সংক্রান্ত মামলার শুনানির সময় খোদ প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের বেঞ্চ একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন তোলে—আদালত কি নতুন করে নির্বাচনের নির্দেশ দিতে পারে? এই একটিমাত্র প্রশ্নই এখন জাতীয় ও রাজ্য রাজনীতিতে এক বিশাল আলোড়ন ফেলে দিয়েছে।

শুনানিতে কী উঠে এল?
প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত ও বিচারপতি জয়মল বাগচীর বেঞ্চে এই মামলার শুনানি চলছে। শুনানির সময় বিচারপতি বাগচী একটি তাত্ত্বিক উদাহরণ দিয়ে বলেন, “ধরুন, কোনো বিধানসভা কেন্দ্রে জয়ের ব্যবধান খুবই কম এবং সেখান থেকে বহু ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ট্রাইব্যুনাল যদি মনে করে যে সেই নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া ভুল ছিল, তবে তো গোটা পরিস্থিতির চিত্রটাই সম্পূর্ণ বদলে যাবে।”

আবেদনকারীর পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণন আদালতে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রতিবেদন জমা দেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনাল এএসআই-এর অধীনে এখনও পর্যন্ত যে ৮৩,০০০ মামলার রায় দিয়েছে, তার মধ্যে প্রায় ৭৫,০০০ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে নাম বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল। অর্থাৎ, প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই নাম বাদ দেওয়ার পদক্ষেপটি সঠিক ছিল না। এটিকে একটি বড় নমুনা হিসেবে ধরে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখার আর্জি জানানো হয়েছে। এর পরেই সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনকে এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

৫টি পয়েন্টে বুঝুন কেন এই বিতর্ক সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়:
১. বিশাল সংখ্যক মামলা: গোপাল শঙ্করনারায়ণনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলায় এসআইআর (SIR) সংক্রান্ত মোট ৩৮ লক্ষ মামলা দায়ের হয়েছে। যার মধ্যে ৩১ লক্ষ মামলা নাম বাদ দেওয়ার বিরুদ্ধে এবং ৭ লক্ষ মামলা নাম তালিকা থেকে মুছে ফেলার জন্য করা হয়েছে। অথচ এত বিশাল মামলার মধ্যে এখনও পর্যন্ত মাত্র ৮৩,০০০টির নিষ্পত্তি বা রায় হয়েছে।
২. ভোটের ব্যবধান ও সমীকরণ: রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি অনুযায়ী বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ও তৃণমূলের প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধানের চেয়ে এসআইআর-এ নাম বাদ যাওয়ার মামলার সংখ্যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
৩. ফলাফলে প্রভাবের দাবি: তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ তথা প্রবীণ আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, রাজ্যে এমন অন্তত ৩১টি আসন রয়েছে যেখানে এসআইআর-এ বাতিল হওয়া ভোটের সংখ্যার চেয়ে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান অনেক কম ছিল। বালি, হেমতাবাদ এবং সাতগাছিয়ার মতো আসনগুলি এর অন্তর্ভুক্ত। শাসকদলের অভিযোগ, এই বাতিল হওয়া ভোটগুলি মূলত তাদেরই সমর্থকদের ছিল।
৪. আদালতের নজিরবিহীন পর্যবেক্ষণ: এর আগে চলতি বছরের ২৩ এপ্রিল শুনানির সময় বিচারপতি জে. বাগচী মন্তব্য করেছিলেন যে, কোনো আসনে জয়ের ব্যবধান খুব কম অথচ একটি বড় অংশের মানুষ ভোট দিতে ব্যর্থ হলে বিষয়টি আদালতের খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
৫. সংবিধানের ক্ষমতা বনাম সুপ্রিম কোর্ট: সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন পরিচালনার সমস্ত ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের হাতে থাকে। তবে অনুচ্ছেদ ১৪২-এর বলে সুপ্রিম কোর্টের যেকোনো পূর্ণাঙ্গ ও বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে। যদিও আদালত এখনও এই বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো নির্দেশ দেয়নি, তবে প্রধান বিচারপতির মুখে ফের নির্বাচনের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে।

এসআইআর নিয়ে এই শোরগোল কেন?
মূলত ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে ভোটার তালিকা সংশোধনের জন্য নির্বাচন কমিশন এই এসআইআর অভিযান শুরু করেছিল। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ্যে আসার পরই তৃণমূল কংগ্রেস অভিযোগ তোলে যে, এই বিশেষ অভিযানের আড়ালে সুকৌশলে তাদের বহু সমর্থক ও ভোটারদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের সেই বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করার পর থেকেই এই তালিকা বিতর্ক বারবার আদালতের দরজায় কড়া নেড়েছে। এখন দেখার, আগামী দিনে সুপ্রিম কোর্ট এই বিশাল আইনি জট কাটানোর জন্য কী চূড়ান্ত রায় দেয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *