সরকারি হাসপাতালে কনট্র্যাক্টে ডাক্তার, নার্স, টেকনিশিয়ান? বড় পদক্ষেপ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর

রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলিতে ডাক্তার, নার্স, টেকনিশিয়ান থেকে শুরু করে সাফাইকর্মী ও সুরক্ষাকর্মীর তীব্র অভাব দীর্ঘদিনের এক পরিচিত সমস্যা। বিশেষ করে গ্রামের দিকের হাসপাতাল ও জেলা হাসপাতালগুলিতে পরিকাঠামোর এই ঘাটতির কারণে সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়। আর এবার এই গুরুতর সমস্যার কথা খোলাখুলি স্বীকার করে নিলেন খোদ রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে এই সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য তাঁর সরকার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে এবং দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।

চলতি সমস্যার মূল কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, বর্তমানে লোকবলের চরম অভাব রয়েছে। নার্সিং স্টাফ, ডাক্তার, টেকনিশিয়ান থেকে শুরু করে পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং নিরাপত্তারক্ষীর সংখ্যা কম থাকার কারণে প্রতিদিন নানা ধরনের প্রশাসনিক ও পরিষেবাগত জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে। তবে এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সরকার যে হাত গুটিয়ে বসে নেই, তা স্পষ্ট করে তিনি জানান যে নতুন করে কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করার ক্ষেত্রে অনেকটাই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তবে নিয়োগ প্রক্রিয়া ঘিরে বিগত দিনের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে বলে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।

নিয়োগে স্বচ্ছতা বজায় রাখার প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে বলেন যে যে কোনো নতুন নিয়োগ মানেই দুর্নীতির একটা অন্তর্নিহিত ভয় কাজ করে। এপ্রসঙ্গে তিনি অতীতে ঘটে যাওয়া ২৬ হাজার শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির প্রসঙ্গ টেনে এনে বলেন, তাঁরা কোনোভাবেই চান না যে দুর্নীতির সেই ভূত নতুন করে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মাথার উপর চেপে বসুক। সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রেখেই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে, যার জন্য কিছুটা অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন। সাধারণ মানুষের কাছে সেই সময় চেয়ে নিয়ে তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে লোকের এই অভাব মেটানোর জন্য সমস্ত রকম চেষ্টা চলছে, যদিও এই কাঠামোগত সমস্যার দীর্ঘমেয়াদী স্থায়ী সমাধানের জন্য কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে।

এদিকে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের পাশাপাশি হাসপাতালের দৈনন্দিন পরিষেবা সচল রাখতে একগুচ্ছ তাৎক্ষণিক বা চটজলদি পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। ‘ভোকাল ফর লোকাল’ বা স্থানীয় স্তরের সুযোগকে কাজে লাগানোর ব্রতে জোর দেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি সমস্ত হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্টদের নির্দেশ দিয়েছেন যে স্থানীয়ভাবে যত জন চিকিৎসাকেন্দ্র বা ডাক্তার উপলব্ধ রয়েছেন, তাঁদের অবিলম্বে কাজে লাগাতে হবে। উদাহরণস্বরূপ তিনি জানান, ধরুন কোনো ডাক্তারের বাড়ি কাটোয়ায় অথচ তাঁকে ডিউটি করতে হচ্ছে বর্ধমান বা কলকাতায়, সেক্ষেত্রে তাঁকে সপ্তাহে অন্তত দুই বা তিন দিন স্থানীয় হাসপাতালেই সময় দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। অনেক ডাক্তারই আছেন যারা সরকারি ক্ষেত্রে স্থায়ীভাবে কাজ করতে চান না, কিন্তু তাঁদের যথাযথ সম্মান ও উপযুক্ত পারিশ্রমিক দিয়ে ‘ভিজিটিং কনসালটেন্ট’ পদে নিয়োগ করতে হবে। কম টাকা দিয়ে তাঁদের হেনস্থা করা হবে না, বরং যোগ্য সম্মান দিয়েই স্বাস্থ্য পরিষেবায় যুক্ত করা হবে।

একই ফর্মুলা অনুসরণ করে প্রয়োজনে স্থানীয় স্তরে টেকনিশিয়ানদেরও যথাযথ পারিশ্রমিকের বিনিময়ে নিয়োগ করা হবে বলে তিনি জানান। তবে নার্সিং স্টাফদের ক্ষেত্রে এই ফর্মুলা কার্যকর করার ক্ষেত্রে কিছু বাস্তবিক সমস্যা রয়েছে, কারণ নার্সদের কাজের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শিফট বা পালা বদলের বাধ্যবাধকতা থাকে। তা সত্ত্বেও এই সমস্যা কাটাতে ইন্টার্নদের সাহায্য নিয়ে কাজ চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এখন দেখার বিষয়, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই নতুন পরিকল্পনা এবং স্থানীয় স্তরে ডাক্তার-কর্মী নিয়োগের নীতি কার্যকর হওয়ার পর রাজ্যজুড়ে সরকারি হাসপাতালের ছবিটা ঠিক কত দ্রুত বদলায় এবং সাধারণ মানুষ কতটা স্বস্তি পান।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *