‘আমাদের ওপর আক্রমণ হয়েছে, এবার যুদ্ধ হবে!’ আমেরিকার বিরুদ্ধে সরাসরি হুংকার ছাড়লেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী

যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার দীর্ঘদিনের মিত্রতার সম্পর্কে এবার বড়সড় ফাটল ধরল। বাণিজ্যিক আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার জেরে দুই দেশের মধ্যকার উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় নিজেদের দাবি মাত্রাতিরিক্ত বাড়িয়ে দিলেও বিনিময়ে অত্যন্ত নগণ্য শর্ত প্রস্তাব করেছে। এই পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ একপাক্ষিক ও অসম চুক্তি আখ্যা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ওটাওয়া।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর নীতি এবং শেষ মুহূর্তে নতুন শর্ত আরোপের তীব্র সমালোচনা করেছেন কার্নি। তাঁর অভিযোগ, ওয়াশিংটন বর্তমানে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে একটি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। মার্কিন অংশীদারিত্বের ওপর কানাডার দীর্ঘদিনের আস্থায় বড় ধাক্কা লেগেছে এবং তাদের প্রতিশ্রুতিগুলি এখন নামমাত্র বলে মনে হচ্ছে। ক্ষোভ উগরে দিয়ে কার্নি বলেন, নতুন মার্কিন শুল্ক চাপানোর সিদ্ধান্ত আসলে কানাডার সার্বভৌমত্বের ওপর এক প্রকার সরাসরি আক্রমণ। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন, “যখন আপনি আক্রান্ত হন, তখন আপনাকে পাল্টা যুদ্ধে লিপ্ত হতেই হয়।” এর উপযুক্ত জবাব দেওয়ার মতো যথেষ্ট অর্থনৈতিক শক্তি ও পরিকল্পনা কানাডার হাতে রয়েছে বলেও স্পষ্ট করে দিয়েছেন তিনি।

আলোচনা কেন ভেস্তে গেল?

গোড়ার দিকে কানাডা মার্কিন ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম এবং গাড়ির ওপর থেকে নিজেদের প্রতিশোধমূলক শুল্ক তুলে নেওয়ার সদিচ্ছা দেখিয়েছিল। এর বিনিময়ে তারা চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রও উল্লেখযোগ্যভাবে নিজেদের শুল্ক হ্রাস করুক এবং কানাডীয় প্রদেশগুলিতে আমেরিকান অ্যালকোহল বিক্রির পথ সুগম করুক। কিন্তু ওয়াশিংটনের শেষ মুহূর্তের দাবিগুলি সমস্ত সীমানা ছাড়িয়ে যায়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শর্তের মধ্যে ছিল—কানাডায় উৎপাদিত গাড়ির ওপর শুল্ক ছাড়ের পরিমাণ কমানো, অন্যান্য দেশের সঙ্গে স্বাধীনভাবে বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে কানাডার হাত পা বেঁধে ফেলা এবং দেশের ভাষা, সংস্কৃতি ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার বিশেষ সুরক্ষাব্যবস্থাগুলিকে দুর্বল করা। এই সমস্ত দাবিকে দেশের স্বার্থের পরিপন্থী ও সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য বলে উড়িয়ে দিয়েছেন কার্নি।

পাল্টা পদক্ষেপ ও অর্থনৈতিক প্রভাব:

শুক্রবার ওয়াশিংটনে দুই দেশের বাণিজ্য বৈঠক সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই দুপক্ষ একে অপরকে দুষতে শুরু করেছে। এই ব্যর্থতার পরেই তাৎক্ষণিক পদক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের কানাডীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত চড়া শুল্ক চাপিয়েছে। এর জেরে ক্ষুব্ধ কানাডাও বসে নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত ইস্পাত, ইলেকট্রনিক্স এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের ওপর ঠিক সমপরিমাণ শুল্ক আরোপের পাল্টা ঘোষণা করেছে ওটাওয়া, যা আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হতে চলেছে।

মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার অবশ্য দাবি করেছেন যে, এই কঠোর পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো আমেরিকান শ্রমিক ও অভ্যন্তরীণ সরবরাহ শৃঙ্খলকে সুরক্ষা দেওয়া। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে আলোচনার কোনো সম্ভাবনা বা পরিকল্পনা নেই বললেই চলে। উল্লেখ্য, গত বছরই দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে প্রায় ৮৮০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য ও পরিষেবা আদান-প্রদান হয়েছিল। ফলে এই বাণিজ্য যুদ্ধ কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কেও সুদূরপ্রসারী ও গভীর প্রভাব ফেলবে বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *