বোর্ডে শুধু হলুদ রঙ, নাম নেই একটি স্টেশনের! ভারতের একমাত্র নামহীন এই স্টেশনের পেছনের রহস্য জানলে অবাক হবেন

ভারতের যেকোনো রেলস্টেশনে পা রাখলেই প্রথমেই চোখে পড়ে প্ল্যাটফর্মের সাইনবোর্ডে বড় বড় অক্ষরে লেখা স্টেশনের নাম। দেশের প্রতিটি ছোট-বড় স্টেশনেরই রয়েছে সুনির্দিষ্ট পরিচিতি। কিন্তু আপনি কি জানেন, ভারতেই এমন একটি স্টেশন রয়েছে যার গায়ে কোনো নাম নেই, নেই কোনো সরকারি পরিচয়ও? আর অবাক করা বিষয় হলো, নামহীন এই অদ্ভুত স্টেশনটি আর কোথাও নয়, রয়েছে আমাদের এই পশ্চিমবঙ্গেই!
পূর্ব বর্ধমান জেলার ব্যস্ত শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই নামহীন স্টেশনটি বর্ধমান-মাসাগ্রাম ব্রডগেজ লাইনের অন্তভূক্ত। খুব একটা বড় বা ব্যস্ত স্টেশন না হলেও, প্রতিদিন এই স্টেশন থেকেই যাতায়াত করেন আশেপাশের বেশ কয়েকটি গ্রামের হাজার হাজার মানুষ। দিনে এই স্টেশনে মাত্র ৬টি ট্রেন দাঁড়ায়। প্ল্যাটফর্মের বোর্ডে কোনো নাম লেখা নেই, শুধুই চারধারে এক প্রলেপ দেওয়া রয়েছে উজ্জ্বল হলুদ রঙের। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই স্টেশন থেকে যাত্রীরা যখন টিকিট কাটেন, তখন জার্নি শুরুর স্টেশনের নাম হিসেবে ‘রায়নগর’ নামটাই মুদ্রিত থাকে।
তাহলে কেন নামহীন হয়ে রয়েছে এই স্টেশনটি?
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এই নামহীন থাকার নেপথ্যে রয়েছে দুটি গ্রামের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিবাদ। অতীতে যখন এই রুটে ন্যারো গেজ লাইন চালু ছিল, তখন এই স্টেশনের পরিচিতি ছিল ‘রায়নগর’ নামে। কিন্তু ২০০৮ সালে ব্রডগেজ লাইন চালুর সময় পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। নতুন ব্রডগেজ স্টেশনটি যে জমিতে তৈরি হয়, তার অবস্থান ছিল রায়না ও রায়নগর—এই দুই গ্রামের ঠিক সীমানার মাঝে।
এরপরই শুরু হয় আসল গোলমাল। নতুন স্টেশনটি নিজেদের গ্রামের জমিতে হওয়ায় রায়না গ্রামের বাসিন্দারা দাবি তুলতে শুরু করেন যে, স্টেশনের নাম দিতে হবে ‘রায়না’। অন্যদিকে, রায়নগর গ্রামের বাসিন্দাদের সাফ দাবি ছিল, পুরনো ঐতিহ্য বজায় রেখে স্টেশনের নাম আগের মতোই ‘রায়নগর’ রাখতে হবে। দুই গ্রামের বাসিন্দাই নিজেদের দাবিতে অনড় থাকেন এবং এই বিরোধ শেষ পর্যন্ত রেলওয়ে বোর্ড থেকে শুরু করে আদালত পর্যন্ত গড়ায়।
দুই পক্ষের দীর্ঘ আইনি টানাপোড়েন এবং প্রশাসনিক জট এখনও কাটেনি। আর এই গ্রামের নাম সংক্রান্ত অধিকারের লড়াইয়ের জটেই মাঝখান থেকে নিজের নাম এবং পরিচয় হারিয়ে ফেলেছে স্টেশনটি। হলুদ রঙের নামহীন এক সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে কোনোমতে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেটি। এখন দেখার বিষয়, দীর্ঘদিনের এই আইনি জটিলতা কাটিয়ে কবে দুই গ্রামের সমঝোতা হয় এবং অবশেষ কবে একটি সঠিক নাম ফিরে পায় এই রেলস্টেশনটি।